দশক খানেক আগেও জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলে ভেসে আসত হস্তলিখিত চিঠির কালিমাখা গন্ধ। কোনো চিঠিতে থাকত প্রবাসে থাকা বাবার খবর, কোথাও ভালোবাসার নরম বার্তা। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষাড়িয়াদহের সাব-পোস্ট অফিসে এমনই কত শত গল্প জমা ছিল একসময়।
কিন্তু সেই ডাকঘরে এখন চলছে মোবাইল ফোন মেরামত। যেখানে একসময় ডাক বিভাগের কর্মচারী ডাক ছাঁটাই করতেন, এখন সেখানে সারিবদ্ধভাবে সাজানো চার্জার, মোবাইল ফোন আর ফ্যানের খুচরা যন্ত্রাংশ। পেছনের ঘরে একজন ব্যক্তি ব্যস্ত মোবাইল ফোন সারাইয়ে।
চর আষাড়িয়াদহের এই ডাকঘর যেন ডিজিটাল যুগের এক প্রতীকী দৃষ্টান্ত- পুরোনো ব্যবস্থার ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন এক বাস্তবতা। সামনের দেয়ালে আজও টাঙানো লাল রঙের চিঠির বাক্সটি মনে করিয়ে দেয়, এটি একটা পোস্ট অফিস। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে ভিন্ন চিত্র। কাঠের টেবিলজুড়ে মোবাইল ফোন যন্ত্রাংশ, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্ক্রিনগার্ড আর সার্ভিসিং যন্ত্রপাতি।
জানা যায়, পোস্ট অফিসটি এখন ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করছেন স্থানীয় রুবেল নামে এক যুবক। তিনি নিজেই বললেন, ‘পোস্টমাস্টার আমাকে বসতে দিয়েছেন। আমি প্রতি মাসে ৪০০-৫০০ টাকা ভাড়া দিই। কোনো নিয়োগপত্র নেই। পোস্টমাস্টার বললে চলে যাব।
স্থানীয় বাসিন্দা কফিল উদ্দিন বলেন, ডাক বিভাগ একসময় মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল। চিঠি, মানি অর্ডার, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র- সবই চলত পোস্ট অফিস ঘিরে। এই ডাকঘরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এখনো স্মরণ করি সেই দিনগুলো। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। ডিজিটাল যোগাযোগের দাপটে হারিয়ে গেছে হাতে লেখা চিঠির আবেদন। সেই সঙ্গে হারিয়েছে দায়িত্বশীলতা, তদারকি আর সরকারি সম্পদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। তাই ডাকঘর এখন রূপান্তর হয়েছে পরিত্যক্ত ভবন হিসেবে।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা নিশান আলী ক্ষোভ নিয়ে বলেন, সরকারি অফিসকে দোকান বানিয়ে রাখা হয়েছে। চিঠি নেই, কর্মী নেই- এটা এখন পরিত্যক্ত ভবন। অথচ বাইরে পোস্ট অফিস লেখা। এটা আমাদের জন্য অপমানজনক।
শিক্ষার্থী ইমাম হোসেন বলেন, ইউনিয়নে একটিই ডাকঘর। সেটাও যদি দোকান হয়ে যায়, তাহলে তো যোগাযোগের পুরোনো ব্যবস্থাও আর রইল না। সরকারের প্রতি আমাদের আস্থা কোথায় রাখব?
এ ডাকঘরের দায়িত্বপ্রাপ্ত পোস্টমাস্টার গোলাম জার্জিস বললেন, উদ্যোক্তা না থাকায় একজনকে অফিস দেখাশোনা করতে বলেছিলাম। সে এখন দোকান করছে। কয়েকবার বলেছি ছাড়তে, এখনো ছাড়েনি। ভবন ভাড়া দিয়ে মাসে কত আয় হয়, এমনটা জানতে চাইলে জার্জিস বলেন, আমি মাসে ১০০ টাকা অফিসে জমা দিই।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে উত্তরাঞ্চলের পোস্টমাস্টার জেনারেল কাজী আসাদুল ইসলাম বলেন, সরকারি ভবন ভাড়া দেওয়ার সুযোগ নেই। এ ধরনের কাজ অবৈধ। কেউ উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করতে পারেন। তবে তার সুনির্দিষ্ট নিয়োগপত্র থাকতে হবে। মোবাইল ফোন সার্ভিসিংয়ের অনুমোদন নেই। আমি খোঁজ নিচ্ছি। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।