নীলফামারীর ডিমলায় তিস্তা নদী থেকে অবাধে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘পাথরখেকোদের’ কবলে পড়ে নদী এখন তার স্বাভাবিক গতিপথ হারাচ্ছে। হুমকির মুখে পড়েছে নদীর জীববৈচিত্র্য ও নদীতীরবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে দিনের বেলাতেই চলছে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ডিমলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে ছয়টিই তিস্তা নদীর ভাঙনকবলিত। যেসব এলাকা থেকে পাথর তোলা হচ্ছে, সেসব এলাকার দুই পাড়ের গ্রামগুলো ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকায় লোহার ছেনি বা ‘জাকলা’ দিয়ে নদীর তলদেশ খুঁড়ে পাথর তোলায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, বেড়েছে ভাঙন ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা।
তীরবর্তী বাসিন্দাদের অভিযোগ, তিস্তা ব্যারাজ, তিস্তা বাজার, তেলির বাজার, চরখড়িবাড়ি, বাইশপুকুর, কালিগঞ্জ ও ভেন্ডাবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২০-৩০ জন পাথর উত্তোলনে জড়িত। প্রতিদিন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে পাথর তোলার কাজ। গত ২৪ জুলাই টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের তেলির বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি পাথরবোঝাই ট্রাক্টর আটক এবং দুইজনকে পাঁচ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিলেও তাতে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।
সম্প্রতি তিস্তা ব্যারাজের উজানে তেলির বাজার, ছোটখাতা এবং ভাটিতে ডালিয়া বাইশপুকুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকরা বেলচা, কোদাল ও শাবল দিয়ে পাথর তুলে অন্তত ১০টি নৌকা বোঝাই করেছেন। পরে সেগুলো ট্রাক্টরে ভরে বিক্রির জন্য স্তূপ করা হয়। বাইশপুকুরে যেখানে পাথর তোলা হচ্ছে, তার মাত্র ৫০০ মিটার উজানেই তিস্তা ব্যারাজ এবং পাশে ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের কাজ চলছে।
পাথরবাহী কয়েকটি ট্রাক্টর চালকের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, পাথর ব্যবসায়ী আয়নাল হক, বাবু, আবু হানিফ, মিস্টার, জামিনুর, ছইাদার রহমানসহ বিভিন্ন জনের কাছে দুদিন ধরে তারা পাথর পৌঁছে দিচ্ছেন।
পাথর ব্যবসায়ী আয়নাল হক বলেন, ‘বিভিন্ন স্থানে পাথর তালা হচ্ছে। সেখানে আপনারা চুপ কেন? আমাদের চেয়ারম্যান-মেম্বার, থানা-পুলিশ, ইউএনও এসব দেখবেন। কোদাল দিয়ে স্থানীয় কয়েকজন গরিব মানুষ পাথর তুলছে। তাতে সমস্যার কোনো কিছু দেখছি না।
পাথর উত্তোলনকারী শ্রমিকরা জানান, নৌকা চলন্ত অবস্থায় শ্যালো ইঞ্জিনচালিত পাখা দিয়ে নদীর তলদেশের বালি সরিয়ে পাথর তুলে পানির ওপরে নিয়ে আসেন তারা। এভাবেই নদীর বিভিন্ন স্থানে ১০ থেকে ১২টি দল পাথর উত্তোলন করছে। উত্তোলিত পাথর ৪০-৫০ টাকা সিএফটি দরে স্থানীয় সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রি করা হয়। আর সিন্ডিকেটের সদস্যরা এসব পাথর ১০০-১২০ টাকা সিএফটি দরে বিক্রি করেন পাথর ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারের কাছে।
পাথর পরিবহনকারী একটি ট্রাক্টরের চালক হাবিব উদ্দিন জানান, তারা ভাড়া চুক্তিতে এক মাস ধরে পাথর পরিবহন করছেন। ডালিয়া বাজারের পাথর ব্যবসায়ী শহীদ ইসলাম তাদের নিযুক্ত করেছেন।
এ বিষয়ে কথা হলে ব্যবসায়ী শহীদ ইসলাম বলেন, ‘যারা নৌকার মালিক তারাই পাথর তুলছে। আমি বিভিন্ন দলের কাছ থেকে প্রতি সিএফটি পাথর ৬৯ টাকায় কিনে ৭১ টাকা দরে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করি। আমার মতো অনেকেই তিস্তা নদীর পাথর প্রতিদিন কিনে নেন।’ তিনি জানান, গত পাঁচ বছর নদীতে পাথর উত্তোলন বন্ধ ছিল। সম্প্রতি আবার শুরু হয়েছে।
বাইশপুকুর এলাকার বাসিন্দা রাফাত ইসলাম জানান, গত এক সপ্তাহে নদীর ভাঙনে তাদের দেড় বিঘা বাদামের খেত বিলীন হয়ে গেছে। আরও দুই বিঘা ফসলি জমি ভাঙনের মুখে।
নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলছেন, অবৈধভাবে পাথর-বালি উত্তোলন করে অনেকেই কোটিপতি হয়েছেন। অনেকেরই বসতভিটা ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নিঃস্ব হয়েছেন কেবল নদীতীরবর্তী বাসিন্দারা। এ ছাড়া পাথর পরিবহনের ট্রাক্টর থেকে পানি পড়ার কারণে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও স্থানীয় সড়কও বেহাল হয়ে পড়েছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, নদী থেকে অতিমাত্রায় পাথর তোলা হলে নদীর তলদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে স্বাভাবিক স্রোতপথ পরিবর্তিত হয়ে বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। তিস্তার ক্ষেত্রেও এখন তাই হচ্ছে।
জানতে চাইলে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘নদীর বালি, পাথরের দায়িত্ব আমাদের না। যারা পাথর উত্তোলন করছে তাদের ধরেন, শাস্তি দেন।
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান বলেছেন, নদী থেকে পাথর উত্তোলনের সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।