সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে ‘মব মচ্ছবে’ পাথর লুটের পর অন্য স্থানে পাথর লুট ঠেকাতে অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। জেলা প্রশাসনের জরুরি সমন্বয় সভায় সাদাপাথর পর্যটন স্পটসহ সব পাথরমহালে যৌথবাহিনী মোতায়েনসহ ৫ দফা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১৩ আগস্ট) রাতে সিলেট জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসনের উদ্যোগে সিলেট সার্কিট হাউসে প্রশাসনিক পদস্থ কর্মকর্তাদের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক শের মাহবুব মুরাদ।
বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে জানিয়ে জেলা প্রশাসক সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা প্রশাসনের সব স্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি সভা করেছি। সভায় আমরা পাঁচটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সিদ্ধান্তগুলো হলো- জাফলং ইসিএ এলাকা ও সাদা পাথর এলাকায় ২৪ ঘণ্টা যৌথবাহিনী দায়িত্ব পালন করবে, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জে পুলিশের চেকপোস্ট যৌথবাহিনীসহ সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে, অবৈধ স্টোন ক্রাশিং মিলের (পাথর ভাঙার কল) বিদ্যুৎবিচ্ছিন্নসহ বন্ধ করার জন্য অভিযান চলমান থাকবে, পাথর চুরির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে, চুরি হওয়া পাথর উদ্ধার করে পূর্বের স্থানে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।
জানা যায়, সিলেটের পাথরমহালে বোমা মেশিনসহ পরিবেশবিধ্বংসী নানা যন্ত্র দিয়ে মাটির তলদেশ থেকে পাথর উত্তোলন করায় পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে কারোনাকালে ইজারা কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে সিলেটের প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথরসহ বিভিন্ন পাথরমহালের পাথর লুটপাট হয়। এ লুটপাট বন্ধ করতে স্থানীয় সব রাজনৈতিক দল একাট্টা হয়ে সরকারের কাছে পাথরমহাল খুলে দেওয়ার দাবি জানায়। এ দাবিতে বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচিও পালন করে বিএনপি-জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনসহ পাথর পরিবহনসংশ্লিষ্ট সংগঠন।
সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের দাবিতে তারা মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, ধর্মঘটসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। ভারতের স্বার্থে বিগত সরকার পাথরমহাল বন্ধ রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর। আর পাথর উত্তোলন করায় সিলেটে ঘনঘন বন্যা হচ্ছে বলেও হাস্যকর সব যুক্তি উত্থাপন করা হচ্ছিল। এসব দাবিদাওয়ায় তোড়জোরে স্থানীয় প্রশাসনের নির্লিপ্ততার সুযোগে পাথরলুটেরা চক্র সক্রিয় হয়। লুটপাটে রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগও ছিল।
এরমধ্যে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে ধলাই নদের উৎসমুখের পর্যটনস্পট সাদাপাথর এলাকায় গত বছরের ৫ আগস্ট প্রথম দফা লুটপাট শুরু হয়। এরপর বছরজুড়ে লুটপাট চলে। সর্বশেষ পাহাড়ি ঢল নামলে সেখানে অনেকটা ‘মব মচ্ছবে’ মেতে চলে পাথর লুট। এ নিয়ে খবরের কাগজে ‘মব মচ্ছবে সাদা পাথরের সর্বনাশ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ হলে পরদিন রবিবার থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ শুরু হয়।
লুটপাটের অভিযোগে বিএনপিদলীয় রাজনৈতিক তৎপরতা থাকায় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলার সহসভাপতি হাজি সাহাব উদ্দিনকে পদ থেকে অব্যাহতি দেয় কেন্দ্রীয় বিএনপি। পরদিন মঙ্গলবার থেকে সাদা পাথর এলাকার পরিস্থিতি বদলায় এবং প্রশাসনও নড়েচড়ে বসে। বুধবার দিনভর সাদাপাথর এলাকায় দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি দল সরেজমিন পরিদর্শন করে লুটপাট প্রত্যক্ষ করেছে। এরপর রাতে প্রশাসনের জরুরি সভা হয়।
২০১৭ সালে পাহাড়ি ঢলে ভোলাগঞ্জ পাথরমহালের ধলাই নদের উৎসমুখে পাঁচ একর জায়গাজুড়ে জমা হয় পাথর। ঢলের তোড়ে সেখানে সর্বশেষ ১৯৯০ সালে একবার পাথর জমা হয়েছিল। সেসব পাথরকে ‘ধলাসোনা’ বলে অভিহিত করা হয়। তবে পাহাড়ি ঢলের পর লুটপাটে সেসব পাথর নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ২৭ বছরের মাথায় ফের পাথর জমা হওয়ায় উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের পাহারায় সংরক্ষিত হয়। ওই বছর থেকে পুরো এলাকাটি প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়।
ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল লুংলংপুঞ্জি ও শিলংয়ের চেরাপুঞ্জি। সেখানকার ঝরনা থেকে সারা বছর নদের পানি প্রবহমান থাকে। বৃষ্টিবহুল চেরাপুঞ্জির পাদদেশ থেকে বর্ষায় ঢলের পানির সঙ্গে পাহাড় থেকে পাথরখণ্ড এপারে নেমে আসে। বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তের দুই দিকের নাম ভোলাগঞ্জ। ভেসে আসা এই পাথর ‘ভোলাগঞ্জের বোল্ডার’ হিসেবে পরিচিত। এ পাথর উত্তোলিত বা আমদানি করা পাথরের চেয়ে দামি।
আরও পড়ুন:
> ‘মব মচ্ছবে’ সাদা পাথরের ‘সর্বনাশ’
> সিলেটের ভোলাগঞ্জ সাদা পাথরে ‘লুটের আঁচড়’
> সাদাপাথর লুটপাটের ঘটনা তদন্তে দুদক
> খবরের কাগজে সংবাদ প্রকাশ: সাদা পাথর লুট করে পদ হারালেন বিএনপি নেতা হাজি সাহাব উদ্দিন
> ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে বাঙ্কারের পাথর সাবাড়
অমিয়/