কুমিল্লা শহরের শাসনগাছা বাসস্ট্যান্ড থেকে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মিরপুর বাসস্ট্যান্ডের দূরত্ব ৩২ কিলোমিটার। সদর উপজেলার একাংশ, বুড়িচং এবং ব্রাহ্মণপাড়া- এই তিন উপজেলার পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের চলাচলের অন্যতম প্রধান সড়ক এটি।
কিন্তু গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সড়কটির শতাধিক স্থানে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গর্ত আর খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। ফলে যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি হাঁটাচলাও কঠিন হয়ে পড়ছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সড়কটি সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। শুধু এ সড়কই নয়, জেলাজুড়ে প্রায় ১২০০ কিলোমিটার সড়কে এমন বেহাল চিত্র দেখা গেছে। মূলত গেল বছরের ভয়াবহ বন্যায় কুমিল্লার ১৭ উপজেলার ১৪টিতেই সড়কের মারাত্মক ক্ষতি হয়; সেই ক্ষত এখনো রয়ে গেছে। বছর ঘুরে আবার বর্ষা শেষে শরৎ এলেও সড়কের সেই ক্ষতচিহ্ন এখনো মেরামত হয়নি।
জানা গেছে, শহরতলী থেকে গ্রাম- সবখানে সড়কের ভয়াবহ অবস্থা। ভাঙা রাস্তায় প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ার ভয়ে এসব সড়কে যানচলাচল অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। দুর্ভোগ লাঘবে স্থানীয়রা ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত সময়ের মধ্যে সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগও (এলজিইডি) সড়কগুলো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে।
সম্প্রতি কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মাধাইয়া-রহিমানগর সড়কে গিয়ে সড়কের দুর্বিষহ চিত্র দেখা যায়। পার্শ্ববর্তী চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার রহিমানগর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার সড়কটি কুমিল্লার চান্দিনার মাধাইয়া বাসস্ট্যান্ডে এসে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যুক্ত হয়েছে। এটি দুই জেলার সংযোগ সড়ক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কটিতে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও সড়কের বড় গর্তগুলোতে পানি জমে জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন উল্টে প্রতিদিনই ঘটছে নানা দুর্ঘটনা।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে যাত্রীরা সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক থেকে নেমে নিজেরাই ঠেলে যানবাহন পার করেন। বন্ধ হয়ে গেছে চান্দিনার নবাবপুর থেকে ঢাকা রুটে চলাচল করা যাত্রীবাহী বাসও। ২৫ কিলোমিটারের ওই সড়কটির ২০ কিলোমিটারই কুমিল্লা অংশে। সড়কের রসুলপুর বাজার ও সিঙ্গাড্ডা এলাকাসহ কয়েকটি স্থানে সৃষ্ট গর্তগুলো দিনে দিনে বড় হয়ে যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বৃষ্টিতে ওই গর্তগুলোতে পানি জমে থাকায় গর্তের গভীরতাও চালকরা ধারণা করতে পারছেন না। গর্তগুলোতে প্রতিদিনই যানবাহন আটকে কিংবা উল্টে যাচ্ছে। রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে বেড়েছে গাড়ি ভাড়া।
চান্দিনা উপজেলার রসুলপুর বাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ী আবুল হাসান বলেন, ‘আমরা এখানে ব্যবসা করি। প্রতিদিনই দোকানের সামনের সড়কের গর্তগুলোতে ২/৪টি ইজিবাইক-সিএনজিচালিত অটোরিকশা উল্টে যায়। আমরা দোকান ফেলে তাদের টেনে উঠাই। আবার উল্টে যাওয়া গাড়িগুলোও উঠাই। এমন পরিস্থিতিতে কেউ এসে এক মুঠ কংক্রিটও ফেলছে না।’
বুড়িচং উপজেলার জগতপুর গ্রামের সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক আবদুল মুমিন বলেন, ‘কুমিল্লা-মিরপুর সড়কটির এমন অবস্থা হয়েছে- এখন আর স্বাভাবিকভাবে যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটে, গাড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়। নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লাগে দিগুণেরও বেশি। ফলে অনেক চালকই এ সড়কে আর গাড়ি চালাচ্ছেন না। যাত্রীদেরও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’
সরেজমিন ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুমিল্লার ১৭টি উপজেলার বিভিন্ন এলাকার প্রায় ১২০০ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে, যেখানে বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে। কোনো কোনো সড়কে স্বাভাবিক চলাচলও দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এসব সড়কের কোনোটি সংস্কারের এক বছরের মধ্যে আবারও বেহাল হয়ে পড়েছে। আবার কোনোটিতে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সংস্কার কাজ হচ্ছে না। এতে গর্ত আর খানাখন্দে ভরা সড়কে চলাচল করতে গিয়ে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার লাখো মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) তথ্যমতে, তাদের অধীনে জেলায় ১০ হাজার ২০০ কিলোমিটার কাঁচা-পাকা সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে ১৫৩১ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ছিল। চলতি অর্থবছরে ৩৬০ কিলোমিটার সড়কের মেরামত হলেও বাকি রয়েছে ১১৭০ কিলোমিটার পাকা সড়কের সংস্কার কাজ। এ ছাড়াও জেলার গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ স্থানের কাঁচা সড়কগুলোতে বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে। কাঁচা-পাকা মিলিয়ে জেলার ১২০০ কিলোমিটারের বেশি সড়ক ভাঙাচোরা। বেহাল এসব সড়কের মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়কও রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ১২০০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্রামীণ সড়কের বেহাল অবস্থা কুমিল্লা আদর্শ সদর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, মনোহরগঞ্জ, লাকসাম, চৌদ্দগ্রাম, নাঙ্গলকোট, সদর দক্ষিণ, বরুড়া, চান্দিনা, দেবিদ্বার ও মুরাদনগরে। এসব উপজেলার গ্রামীণ সড়কে দীর্ঘদিন ধরে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়ে আছে। দিন দিন গর্তের গভীরতা বাড়ছে।
এলজিইডি কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আশরাফ জামিল বলেন, গত বছরের ভয়াবহ বন্যায় প্লাবিত এবং অতি বৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জেলার ১৫৩১ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। গুরুত্ব বিবেচনায় চলতি বছর বরাদ্দ হওয়া অর্থে ৩৬০ কিলোমিটার সড়কের সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে। তবে এখনো ১১৭০ কিলোমিটার সড়কের কাজ বাকি রয়েছে। যা দ্রুত সময়ের মধ্যে সংস্কার প্রয়োজন। এসব সড়কের উন্নয়নে সরকারের কাছে বাজেট দেওয়া হয়েছে। অর্থ পেলেই দ্রুত সংস্কার কাজ শুরু হবে।