মৌলভীবাজারে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে কিডনি রোগীদের জন্য চালু থাকা ডায়ালাইসিস সেবাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সরকারিভাবে অর্থ বরাদ্দ না থাকায় বর্তমানে সীমিত পরিসরে মাত্র ১৫ জন পুরোনো রোগীকে সেবা দেওয়া হচ্ছে ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন কোনো রোগীকে গত এক মাস ধরে ডায়ালাইসিসের আওতায় নেওয়া হচ্ছে না। এমনকি পুরোনো রোগীদের জন্য যে সেবা এখনও সীমিতভাবে চলছে, সেটিও আগামী সেপ্টেম্বরের পর পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এদিকে এই সংকটে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত কিডনি রোগীরা। জীবন রক্ষাকারী এই নিয়মিত চিকিৎসার জন্য তারা এখন বাধ্য হচ্ছেন বেসরকারি হাসপাতালে যেতে, যেখানে প্রতি সেশনে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত হাজার হাজার টাকা।
জরুরিভিত্তিতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করে সেবাটি সচল রাখার দাবি জানিয়েছেন রোগী, স্বজন ও সচেতন মহল।
মৌলভীবাজার জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে মোট ১৭টি ডায়ালাইসিস মেশিন থাকলেও বর্তমানে সচল রয়েছে ১৫টি। প্রতিটি রোগীকে ২০ হাজার টাকার প্যাকেজে ৪৮টি সেশনের ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়া হয়। প্রতি সেশনের গড় ব্যয় প্রায় ৪০০ টাকা, এখানে বাকিটুকু সরকারিভাবে ভর্তুকি হিসেবে প্রদান করা হয়ে থাকে। মাসে প্রায় ৩০০ সেশন পরিচালনার জন্য প্রতি বছরে প্রায় ১ কোটি টাকার প্রয়োজন।
কয়েকজন রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিডনি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেলে নিয়মিত ডায়ালাইসিস ছাড়া বাঁচার উপায় নেই। সরকারি হাসপাতালে সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা পাওয়ায় অনেকেই বেঁচে থাকার আশা পেয়েছিলেন। এখন তা বন্ধ হয়ে গেলে চিকিৎসা ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে।
তারা আরও জানান, সরকারি হাসপাতালে সিরিয়াল পাওয়া যায় না। আর বেসরকারি হাসপাতালে প্রতি সেশনে ৩ হাজার ৫০০ টাকা লাগে। কেউ কেউ সিলেট শহরে গিয়ে চিকিৎসা নেন। এতে যাতায়াতসহ অন্যান্য খরচ আছে। প্রাইভেটে ডায়ালাইসিস চিকিৎসা নেওয়া অনেক ব্যয়বহুল, যা সব রোগী বহন করতে পারে না।
কিডনি রোগী লোকমান আহমেদ বলেন, সরকারি হাসপাতালে আগে ডায়ালাইসিস করতাম। মাঝে একটি ইনফেকশনের কারণে প্রাইভেট হাসপাতালে যাই। সেখানে ডায়ালাইসিস করাই। এখন সদর হাসপাতালে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, নতুন রোগীদের আর নেওয়া হচ্ছেনা। সপ্তাহে দু’বার ডায়ালাইসিস করাতে হয়। আর প্রতি সেশনে খরচ পড়ে ৩ হাজার ৫শ টাকা। এত টাকা নিয়মিত খরচ করা অসম্ভব।
সম্প্রতি সিলেট থেকে ডায়ালাইসিস করে এসেছেন রোগীর স্বজন আখলাক হোসেন। তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতাল না পেয়ে বাধ্য হয়ে প্রাইভেটে আমার রোগীকে নিয়েছি। প্রাইভেটে চিকিৎসার খরচ বেশি। কিন্তু কতদিন এভাবে চালানো সম্ভব, জানিনা।
সমাজকর্মী সোনিয়া মান্নান বলেন, জেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিসের মতো সেবা চালু থাকাটা দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষদের জন্য বাঁচার সুযোগ তৈরি করে। সেবাটি বন্ধ হয়ে গেলে কেবল চিকিৎসা নয়, পুরো পরিবারগুলোর জীবন-যাপনও হুমকির মুখে পড়বে।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠক আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, জেলা হাসপাতালের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট এমনভাবে বন্ধ হয়ে যাবে তা খুবই দুঃখজনক। অনেক গরিব পরিবার সর্বস্ব বিক্রি করে বেসরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করাচ্ছে। সরকারি সেবা বন্ধ হয়ে গেলে এসব পরিবার দিশেহারা হয়ে যাবে। আমরা চাই জরুরিভিত্তিতে বরাদ্দ নিশ্চিত করে সেবাটি চালু রাখা হোক।
মৌলভীবাজার জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক প্রণয় কান্তি দাশ বলেন, আমাদের আগের কয়েকজন কিডনি রোগী ডায়ালাইসিস চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের আরও এক থেকে দেড় মাস এই সেবা দেওয়া যাবে। তবে গত এক মাস ধরে নতুন কোনো রোগীকে ডায়ালাইসিস সেবার আওতায় আনা যায়নি। আমরা আগামী এক বছর সেবা চালু রাখার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ১ কোটি টাকার বরাদ্দ চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। আশা করছি, সেবা পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আগেই বরাদ্দ পাওয়া যাবে।
জেলা প্রশাসক মো. ইসরাইল হোসেন বলেন, ডায়ালাইসিস সেবা চালু রাখার জন্য আমার পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে স্বাস্থ্য সচিব বরাবর ১ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে সেবাটি আরও অন্তত এক বছর চালানো সম্ভব হবে।
পুলক/নাঈম