চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দুর্গম পাহাড়ে অস্ত্র তৈরির কারখানার সন্ধান পেয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এ সময় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। আটক করা হয় চার সন্ত্রাসীকে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে সেনা অভিযানে চারজন আটকের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল করা হয়েছে। ফেসবুকে আপলোড করা এক ভিডিওতে দেখা যায়, অস্ত্র উদ্ধার ও আটকের ঘটনাকে ষড়যন্ত্র দাবি করে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার নেতৃত্বে তা প্রতিহত করার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়। যদিও তাদের বিরুদ্ধে পাহাড় কাটাসহ আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মানুষ হত্যার অভিযোগ রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ওই এলাকায় রোকন বাহিনীর নেতৃত্বে সশস্ত্র পাহারায় দিন-রাত পাহাড় কাটা হচ্ছিল। ওই এলাকায় কেউ যেতে সাহস পেত না। এমনকি প্রশাসনও সেখানে বড় ধরনের অভিযান চালাত না। চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা জেলা প্রশাসন মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান চালালেও পাহাড়খেকোদের কেউ বিরক্ত করতে চায় না। এ কারণে প্রতিদিনই নির্বিচারে পাহাড় কাটা হয়।
জানা গেছে, শনিবার সকাল থেকে জঙ্গল ছলিমপুরের দুর্গম পাহাড়ে যৌথ বাহিনী অভিযান চালায়। অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। সীতাকুণ্ড মডেল থানার পুলিশ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, আটকদের সীতাকুণ্ড স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে থানায় আনা হয়। তাদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চলছে।
আটরা হলেন সলিমপুর ইউনিয়ন ছাত্র দলের সাবেক সহসভাপতি কামরুল হাসান রেদোয়ান (৩৫), ইউনিয়ন যুব দলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশিক (৩৫), অস্ত্র তৈরির কারখানার কর্মচারী রুমন (২৫) ও মো. আমির ইসলাম (৪০)।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ সূত্রে জানা গেছে, সীতাকুণ্ডের সলিমপুর ইউনিয়নের ছিন্নমূল এলাকায় সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে একটি দেশীয় অস্ত্র তৈরির কারখানার সন্ধান পাওয়া যায়। ওই কারখানা থেকে ছয়টি দেশীয় অস্ত্র, ৩৫ রাউন্ড খালি কার্তুজ, পাঁচ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, একটি চায়নিজ কুড়াল, ২০টি ছুরি, চার্জারসহ দুটি ওয়াকিটকি, একটি মেগাফোন, চারটি প্যারাসুট ফ্লেয়ারসহ একাধিক অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
এদিকে সেনাবাহিনীর অভিযানে চারজনকে আটকের প্রতিবাদে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা বিক্ষোভ মিছিল করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আপলোড করা এক ভিডিওতে নিজেদের বিএনপি নেতা দাবি করে স্থানীয় যুবদল নেতা রোকন উদ্দিন মেম্বারের নেতৃত্বে ‘ষড়যন্ত্র’ প্রতিহত করা হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। তারা সলিমপুর ইউনিয়ন যুব দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রোকন উদ্দিন মেম্বারের অনুসারী বলে দাবি করে বক্তব্য দেন। ওই মিছিলে উপস্থিত ছিলেন ইসমাইল, রাসেল, বাবু, সুমন, লন্ডনি আরিফ ও ছুট্টসহ অর্ধশতাধিক বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী। তারা সবাই যুবদল নেতা রোকন উদ্দিনের অনুসারী বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এক বছরে ৪ খুন
গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর আধিপত্য বিস্তার ও দখলদারিত্ব বজায় রাখতে জঙ্গল ছলিমপুরে চারটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। সেনাবাহিনীর অভিযানে আটক কামরুল হাসান ওরফে রিদোয়ান গত ৯ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় বিএনপি নেতা মোহাম্মদ মাসুদকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে প্রকাশ্যে খুন করে। জঙ্গল সলিমপুর ৫ নম্বর ছিন্নমূল এলাকায় পাহাড়ের মাটি, ইট, বালু, কংক্রিটের ব্যবসা দখলে নিতে এই খুনের ঘটনা ঘটে।
গত ২ জানুয়ারি দলীয় কর্মীর হাতে খুন হন সীতাকুণ্ডের ছলিমপুর ইউনিয়ন শ্রমিকদলের সভাপতি মীর আরমান। ঘর থেকে মুঠোফোনে ডেকে নিয়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে জিম্মি করে ডান পায়ের রগ কাটার পর তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তিনি।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সিডিএ আবাসিক এলাকাসংলগ্ন জঙ্গল ছলিমপুরে বৃদ্ধ আবুল কালাম খুন হন। তিনি ছিলেন বিএনপির সমর্থক। রাতে বিএনপির নেতারা তাকে পিটিয়ে বেঁধে রাখে। পরদিন ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে গাছের সঙ্গে রশি দিয়ে ঝুলানো অবস্থায় পরিবারের সদস্যরা তার মরদেহ উদ্ধার করে।