রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার দরবারে হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও কবর থেকে মরদেহ তুলে পোড়ানোর পাশাপাশি ওই দিন পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশ বাদী হয়ে দায়ের করে। ওই মামলায় আজ মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এছাড়া দরবারে মরদেহ তুলে পোড়ানোর পাশাপাশি হামলার ঘটনায় ওই দিন নিহত ভক্ত রাসেল মোল্লার বাবা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন গোয়ালন্দ ঘাট থানায়। গতকাল সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে রাসেল মোল্লার বাবা মো. আজাদ মোল্লা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ৪ হাজার অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
এ মামলায় পুলিশ দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলেন - মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর এলাকার বাহাউদ্দিনের ছেলে মো. লতিফ (৩৪) এবং গোয়ালন্দ পৌরসভার চৌধুরী পাড়া এলাকার বিল্লালের ছেলে অভি মন্ডল রঞ্জু (২৯)। মো. লতিফ কবর থেকে মরদেহ তোলার প্রধান নির্দেশদাতা।
লতিফ বর্তমানে গোয়ালন্দ পৌরসভার জুরান মোল্লার পাড়া এলাকায় বসবাস করেন। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, লতিফ নুরাল পাগলের মরদেহ কবর থেকে তোলা ও পোড়ানোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি মো. রাকিবুল ইসলাম।
নুরাল পাগলের ভক্ত নিহত রাসেল মোল্লার বাড়ি গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের তেনাপচা গ্রামে। পেশায় তিনি ছিলেন গাড়িচালক। ঘটনার দিন রাসেল ও তার ছোট ভাই দরবারের ভেতরে ছিলেন। বিক্ষুব্ধ জনতার আক্রমণে গুরুতর আহত হন রাসেল। তাকে উদ্ধার করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে সেখানেও তাকে আক্রমণ করা হয়। পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু হয়।
গত শুক্রবার (৫ সেপ্টেম্বর) নুরাল পাগলের দরবারে হামলার আগে নুরাল পাগলের কবর উঁচু থেকে নিচু করাসহ বিভিন্ন দাবিতে জুমার নামাজের পর ‘ইমান আকিদা রক্ষা কমিটি’র ব্যানারে পূর্বঘোষণা অনুযায়ী গোয়ালন্দ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ফকীর মহিউদ্দিন আনসার ক্লাবে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়।
বিক্ষোভ সভায় বক্তব্য শেষে বিক্ষুব্ধ জনতা দরবারের দিকে যেতে চাইলে স্থানীয় প্রশাসন ও থানা পুলিশ তাদের নিবৃত করার চেষ্টা করে। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সরকারি গাড়ি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসির গাড়ি ভাঙচুর করে। পরে দরবারে তাণ্ডব চালানো হয়। এ ঘটনার পর মামলা হলে তাণ্ডবে অংশ নেওয়া লোকজন গ্রেপ্তারের ভয়ে গা-ঢাকা দিয়েছে।
গোয়ালন্দ পৌর এলাকায় অবস্থিত জামিয়া নিজামিয়া আরাবিয়া দাওরায়ে হাদিস মাদ্রাসা। এ মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ওই দিন বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেয়। এর পরের রবিবার থেকে হঠাৎ করেই মাদ্রাসাটি ৭ দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ, কোনো ছাত্র-শিক্ষক নেই। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর মক্তব বিভাগের হাফেজ ওবায়দুর নামে এক শিক্ষককে পাওয়া যায়। তিনি জানান, সেদিন বিক্ষোভ মিছিলে মাদ্রাসার বড় হুজুর আসিনুল ইসলাম কাশেমীর নেতৃত্বে সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়েছিলেন। মিছিল শেষে বড় হুজুর সবাইকে চলে যেতে বলেন, আমরা চলে আসি। কিন্তু অনেকেই গিয়ে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। আমরা ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে কেউ জড়িত নই। তারপরও আতঙ্কে সবাই বাড়ি চলে গেছেন।
তিনি আরও বলেন, যারা এই ঘৃণ্য কাজ করেছেন তাদের সঠিক তদন্ত করে বিচার করা উচিত। মুসলিম হিসেবে বিষয়টি নিয়ে আমি লজ্জিত। কবর থেকে লাশ তুলে পোড়ানো সমর্থন করি না, অবশ্যই বিচার চাই।
ঘটনার দিন বিক্ষোভে অংশ নেওয়া গোয়ালন্দ বাজারের পুস্তক ব্যবসায়ী সামাদ বলেন, ভাই, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ছিল। এর মধ্যে অনেকেই হাতুড়ি-শাবল নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেয়। তখন বিক্ষোভ শেষ করে দেওয়া হয়। পরে ওই লোকগুলো মিছিল থেকে দরবারে গিয়ে এসব করে। পুলিশ ভিডিও দেখে সবাইকে গ্রেপ্তার করুক, আমিও চাই। সঠিক বিচার হোক।
নুরাল পাগলের দরবারে তাণ্ডব ও তার মরদেহ পোড়ানোর ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অতীতে সারা দেশে মাজার ও খানকা শরীফ ভাঙচুরের ঘটনায় সরকারের উদাসীনতা ও বিচার না হওয়া নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।
গোয়ালন্দ রাবেয়া ইদ্রিস মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল কাদের শেখ বলেন, আমাদের বিবেকবোধ সব নষ্ট হয়ে গেছে। এই দরবার শরীফে যা ঘটেছে, পৃথিবীর ইতিহাসে কোথাও হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, তারপর কবর থেকে মরদেহ তুলে মহাসড়কে আগুন দিয়ে পোড়ানো হলো। এই দীর্ঘ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কী করলো? এজন্য তাদের ভূমিকা নিয়েও আমার প্রশ্ন আছে। আমি ন্যায় বিচার আশা করি। যারা পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছে তারাও যেন বিচারের আওতায় আসে। আর নিরীহ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হয়।
এদিকে সোমবার থেকে নুরাল পাগলের দরবারে সাধারণ মানুষ ও ভক্তদের প্রবেশ বন্ধ রেখেছে পুলিশ। নুরাল পাগলের পরিবারের সদস্যরাও ঘটনার পর থেকে বাড়িছাড়া। দরবারজুড়ে তাণ্ডবের ক্ষতচিহ্ন একইভাবে রয়ে গেছে।
রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরীফ আল রাজীব জানান, এই নির্দেশদাতা লতিফের নাম আরেকজনের জবানবন্দি থেকে এসেছে এবং ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে। তবে নির্দেশদাতা একজন নয়। সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
সুমন বিশ্বাস/মাহফুজ