সত্তরোর্ধ্ব হামেলা বেগম। আড়াই বছর আগে স্বামীকে হারিয়েছেন। দুই ছেলের দিনমজুরির আয়ে চলে সংসার। ১১ শতাংশ জমির ওপর ছিল তাদের ঘর। কিন্তু তরা নদী থেকে অব্যাহত বালু তোলার কারণে সেই ভিটার অর্ধেকই এখন নদীর পেটে চলে গেছে। ভাঙনের পাড়ে দাঁড়িয়ে তিনি জানতে চাইলেন- আর একটু ভাঙলে সন্তানদের নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেব? অশ্রুসিক্ত নয়নে এভাবেই নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করছিলেন তিনি।
মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরী ইউনিয়নের তরাগ্রামে হামেলা বেগমের মতো আরও অনেক পরিবার দিশাহারা। তরা নদীতে ড্রেজার দিয়ে লাগাতার বালু তোলায় সাধারণ মানুষ বসতভিটা হারাচ্ছেন। সর্বশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত পাঁচটি পরিবার। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইজারা পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সীমা মানছে না। সকাল থেকে রাত অবধি ছয় থেকে আটটি ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। শুধু বসতভিটাই নয়, ঝুঁকিতে রয়েছে তরা সেতুর পাশাপাশি বিদ্যালয়, মন্দির এবং মসজিদ।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল মানিকগঞ্জের পাঁচ উপজেলার সাতটি বালুমহালের জন্য একবছর মেয়াদি দরপত্র আহ্বান করে জেলা প্রশাসন। ঘিওর উপজেলার তরা-‘ক’ বালুমহাল ৩ কোটি ৬৯ লাখ ২২ হাজার ৮০৫ টাকা সম্ভাব্য ইজারা মূল্য নির্ধারণ করা হয়। আর বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলন করার জন্য পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় ৯৫ লাখ ৯০ হাজার ৩৩৮ ঘনফুট। সব নিয়ম মেনে চলতি বছরের জুনে ৭ কোটি ৫১ লাখ ৯৯ হাজার ৯০০ টাকায় ইজারা নেয় মেসার্স রিজু এন্টারপ্রাইজ। এর সঙ্গে ইজারা মূল্যের ১০ শতাংশ আয়কর ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট পৃথকভাবে নেওয়া হবে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ‘ঢাকা-আরিচা’ মহাসড়কের তরা সেতুর প্রায় ৩শ থেকে সাড়ে ৩শ মিটারের মধ্যেই পাঁচ থেকে ছয়টি ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। সকাল থেকে শুরু হওয়া এই বালু উত্তোলন চলে রাত পর্যন্ত। অন্যদিকে, আরও একটি ড্রেজার বসানো হয়েছে ঠিক রমজান আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের কাছেই। সেখানে সারা দিন ড্রেজার চলায় ক্ষতির মুখে আছে বিদ্যালয়সহ মসজিদ, মন্দির ও বসতভিটা।
ভাঙনের শিকার ওই এলাকার বাসিন্দা রোকেয়া বেগম বলেন, ‘এই যে নদীটার মইধ্যে আট দশটা ডোজার (ড্রেজার) দিয়ে বালু কাটতাছে, আমরা না কইরা ফিরাইবার পারি না। বোটগুইলা আমাগো বাড়ির কাছ দিয়া বাইন্দা রাহে। এইবার ভাঙনে আমার ঘর-দরজা ভাঙছে। ঘর কাত হইয়া পড়ে আছে। আমাগো আর কোনো সম্পদ নাই যে অন্য কোথাও গিয়া থাকুম।’
আরেক ভুক্তভোগী নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বাড়ি ছিল ২২ শতাংশ জমির মধ্যে। প্রতিবছর ড্রেজার দিয়ে এভাবে মাটি কাটে। এতে ভাঙতে ভাঙতে এখন মাত্র চার-পাঁচ শতাংশ জমি অবশিষ্ট আছে।’
আরেক ভুক্তভোগী পারুল বিশ্বাস বলেন, ‘নদীর পাড় থেকে চার-পাঁচ হাত দূরে রান্নাঘর ও ছেলের ঘর ছিল। কিন্তু ড্রেজার দিয়ে বালু তোলায় কয়েক মাসের ব্যবধানে ঘরগুলো ধসে গেছে। এভাবে চললে আমরা কীভাবে বাঁচব।’
রমজান আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিত্যানন্দ বসাক বলেন, ‘ইজারাদার নিয়ম মেনে বালু তোলা হচ্ছে না। ড্রেজারের বিকট শব্দে পড়াশোনা করানো কষ্টকর হয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে স্কুলের পাশের মসজিদ-মন্দির হুমকিতে পড়বে। এসব বন্ধে আমরা গণস্বাক্ষরসহ একটি স্মারকলিপি জেলা প্রশাসককে দেব।’
বালুমহাল ইজারা নেওয়া প্রতিষ্ঠান মেসার্স রিজু এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী কামাল হোসেন বলেন, ‘তরা ব্রিজের ওপর থেকে দেখলে মনে হবে খুব কাছ থেকে বালু তোলা হচ্ছে। কিন্তু আপনি সেখানে গিয়ে দেখেন- আমরা কত দূর থেকে কাজ করছি। ডিসি অফিস থেকে যে জায়গা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে সেখান থেকেই আমরা বালু তুলছি।’
তবে সড়ক বিভাগ বলছে- সেতুর এক কিলোমিটারের মধ্যে ড্রেজারে বালু তুললেই সেটি ঝুঁকিতে পড়ে যায়। জেলা প্রশাসনের দাবি, সীমার বাইরে বালু কাটার কোনো সুযোগ নেই। মানিকগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবদুল কাদের জিলানী বলেন, ‘ব্রিজের এক কিলোমিটারের মধ্যে খননযন্ত্র দিয়ে বালু তুললে ব্রিজের পিলার ও পাইল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে করে ব্রিজের আয়ুষ্কাল কমে যাবে।’
জেলা প্রশাসক ড. মানোয়ার হোসেন মোল্লা বলেন, ‘ইজারার বাইরে গিয়ে বালু তোলার কোনো সুযোগ নেই। এর আগে কয়েকবার ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদেরকে জরিমানা করা হয়েছে। তারা যদি নিজে থেকে ঠিক না হন তাহলে আমরা তাদের ইজারা বাতিলের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেব।’