দেশের পঞ্চম বৃহত্তম পৌরসভা যশোরে চার লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। এ শহরে সরকারি-বেসকারি গুরুত্বপূর্ণ অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল-ক্লিনিক, ব্যাংক-বিমাসহ নানা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফলে সকাল থেকেই চাকরিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে যশোর শহর। ১৪.৭২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ শহরে দীর্ঘ বছর ধরে যানজট নিরসনে উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি যশোর পৌরসভা ও ট্রাফিক বিভাগ। বর্তমানে তিন চাকার যান ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও থ্রি-হুইলার শহরের সড়ক দখল করে নিয়েছে। তাদের বেপরোয়া চলাফেরায় মানুষের যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালত ছুটির পর শহরের অন্তত পাঁচটি স্থানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যাম লেগে থাকে। এ সময় যত্রতত্র খালি রিকশা-ইজিবাইকের জটলা বাঁধে। তারা যাত্রী তোলার জন্য এলামোলোভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। এর মধ্যে প্রাইভেটকার ও স্কুল বাস যদি শহরে প্রবেশ করে, তাহলে দুর্ভোগের শেষ নেই। এ ছাড়া রয়েছে ফুটপাত দখল ও ভ্রাম্যমাণ স্ট্যান্ড।
ফুটপাত দখল করে একদিকে যেমন ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা ভ্রাম্যমাণ দোকান তৈরি করেছেন, অন্যদিকে বড় বড় ব্যবসায়ীরা সরকারি রাস্তার ফুটপাতে নিজ উদ্যোগে টাইলস লাগিয়ে দখল করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। শহরের জিরো পয়েন্ট থেকে উকিলবার মোড় পার হতে এক থেকে দেড় মিনিটের পথ। অথচ বেলা ১১টা থেকে দুপুর পর্যন্ত সময়ে আধা ঘণ্টাতেও তা পার হওয়া যায় না। আর বিকেল ৫টার পর থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত শহরের দড়াটানা থেকে হাসপাতাল মোড়ের দুই মিনিটের পথ পার হতে ন্যূনতম সময় লাগে আধা ঘণ্টার বেশি।
যশোর পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, পৌর এলাকার ভেতরে মোটরচালিত রিকশা চলাচলের কোনো অনুমতি নেই। বিগত সময়ে ২ হাজার ৯৯৩টি পায়েচালিত রিকশা, ৪ হাজার ৪৬৮টি ইজিবাইক ও ৩০০টি ভ্যান গাড়ির জন্য লাইসেন্স দেওয়া আছে। তবে, পায়েচালিত রিকশার অনুমোদনের আড়ালে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ১৫ হাজারের বেশি মোটরচালিত রিকশা শহরজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
জানা গেছে, অনুমোদন না থাকলেও প্রশাসনের নাকের ডগায় শহরের বেশ কিছু এলাকায় প্রতিদিন মোটরচালিত রিকশা তৈরি হয়। রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এসব মোটরচালিত রিকশা নিয়ে গ্যারেজ তৈরি করছেন। সেখানে ২৫০ টাকা দৈনিক চুক্তিতে খুব সহজে একদিনের জন্য রিকশা ভাড়া পাওয়া যায়। এ ভাড়ায় চালিত রিকশা পেতে মালিকের কাছে জমা রাখতে হয় ভোটার আইডি কার্ড ও এক কপি ছবি। যেকোনো মাধ্যমে যেকোনো বয়সের মানুষ গ্যারেজ মালিকের কাছে গেলে বয়সের বাছবিচার না করে গ্যারেজ মালিক চালকের হাতে রিকশার চাবি তুলে দেন। যশোর শহরে এ যানবাহন চালাতে চালকের কোনো লাইসেন্সের প্রয়োজন পড়ে না, দরকার হয় না নির্দিষ্ট কোনো বয়সও।
কয়েক দিনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্র দড়াটানা থেকে রেলগেট মোড় এবং দড়াটানা থেকে নিউ মার্কেট এলাকা। একইভাবে, দড়াটানা থেকে মণিহার মোড় ও দড়াটানা থেকে বিমান অফিস মোড় এলাকা পর্যন্ত সড়কে যানজট লেগে থাকে। শহরের এ গুরুত্বপূর্ণ সড়কের অংশে বেশ কিছু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যানজটের মূল কারণ হিসেবে জনগুরুত্বপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হলেও এর ভেতরে রয়েছে আরও কিছু কারণ। এসব এলাকায় প্রায় ৩০টি অস্থায়ী যানবাহনের স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। এসব স্ট্যান্ডে একের পর এক যানবাহন অবস্থান করে থাকে। যেখানে দিনে গড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার গাড়ি অবস্থান করে। যশোর পৌরসভার নির্দিষ্ট কতগুলো স্ট্যান্ড রয়েছে এবং সেই স্ট্যান্ডগুলোর ঠিক কতগুলো যানবাহন ধারণক্ষমতা রয়েছে, তার কোনো তথ্য দিতে পারেনি যশোর পৌরসভা।
এ ছাড়া রয়েছে একাধিক স্থায়ী-অস্থায়ী পার্কিং এরিয়া। এ পার্কিং এরিয়াগুলো মূল সড়কলাগোয়া, যে কারণে গাড়ি পার্কিংয়ের সময় সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। সড়কের অনেক অংশে ফুটপাত না থাকার কারণে বা ফুটপাত দখলের কারণে সাধারণ পথচারীরা সড়কের যত্রতত্র চলাচল করে। জেব্রা-ক্রসিং বা রোড সিগনাল না থাকার কারণে সড়ক পারাপারেও দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।
রবিউল ইসলাম বাবু নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘শহরে চলাচলের মতো পরিবেশ নেই। এত যানজট যে নির্দিষ্ট সময়ে কর্মস্থলে উপস্থিত হওয়াও কঠিন। দড়াটানা ব্রিজ পার হওয়াটা জরুরি। অনেক সময় হেঁটে যানজট এড়িয়ে পুনরায় গাড়িতে উঠতে হয়। এতে করে বাড়তি অর্থ ও সময় নষ্ট হয়।’
ইজিবাইকচালক মোতাহার হোসেন বলেন, ‘সকাল থেকে গ্রামগঞ্জ থেকে রিকশা-ইজিবাইক শহরে চলে আসে। সারা দিন শহরে অবস্থান করে যাত্রী টানে। হাসপাতাল এলাকায় রোগী নিয়ে যাওয়ার মতোও পরিবেশ নেই। মাঝে মাঝে প্রশাসন নামমাত্র যানজট নিরসনে কাজ করে। দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। আমরা ১৪ হাজার টাকা দিয়ে লাইসেন্স করে ভাড়া টানি। গ্রাম থেকে ইজিবাইক চলে আসে, ১০ থেকে ২০ টাকা দিয়ে তারা মূল শহরে ঢুকে পড়ছে। এসব দেখার কেউ নেই।’
যশোর পৌরসভার সহকারী লাইসেন্স পরিদর্শক জানান, পৌর এলাকার ভেতরে মোটরচালিত যানবাহনের নিবন্ধন বন্ধ রয়েছে। তবে অনুমোদিত পায়েচালিত রিকশা, ভ্যান ও ইজিবাইকের লাইসেন্স নবায়নের কাজ চলমান রয়েছে। যশোর জেলা পুলিশের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমানের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। অফিসে গিয়েও তার দেখা মেলেনি।
যশোর পৌরসভার প্রশাসক রফিকুল হাসান বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশ, যশোর পৌরসভা, জেলা প্রশাসন- সবাই মিলে যানজট নিরসনে কাজ করতে হবে। আমরা কাজ করতে চাই। এবার উদ্যোগ নিয়েছি। লাইসেন্সবিহীন কোনো গাড়ি মূল শহরে প্রবেশ না করলে যানজট হবে না।’ তিনি বলেন, ফুটওভার ব্রিজ সড়ক বিভাগ করতে পারে। তাহলে যানজট কমবে। সড়কের আইল্যান্ডগুলো দ্রুত রং করার প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।