মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার বুক চিরে একসময় বয়ে চলা প্রাণচঞ্চল ইছামতী নদী। ধানখেত সিঞ্চিত হতো এর জলধারায়। জেলেদের জালে উঠত ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি মাছ। কিন্তু এখন আর তা হয় না? অপরিকল্পিত বাঁধ আর দখলদারদের আগ্রাসনে আজ নদীটি মৃতপ্রায়। জীবনের স্পন্দন হারিয়ে নদীটি এখন দূষণ আর দখলের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে বর্ষায় জমে থাকা পানিতে আটকে যাচ্ছে কচুরিপানা, যা পচে সৃষ্টি হচ্ছে দুর্গন্ধ। হচ্ছে পরিবেশ দূষণ।
জমে থাকা আবর্জনা ও মানববর্জ্যে নদীটি দূষিত হচ্ছে। ফলে এ অঞ্চলের হাজারও পরিবার আজ সুপেয় পানিসংকটে ভুগছে।
জানা যায়, জেলার দৌলতপুর থেকে ঘিওর, শিবালয়ের উথুলী, নালী, নয়াকান্দি হয়ে হরিরামপুরের মাচাইন, বাল্লা, ঝিটকা অতিক্রম করে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই নদী বাহাদুরপুরে এসে মিশেছে পদ্মার সঙ্গে। পদ্মার ভাঙনে নদীর বহু অংশ বিলীন হলেও একটি শাখা এখনো টিকে আছে। এই শাখাটি বকচর, দড়িকান্দি, বাহিরচর, লেছড়াগঞ্জ বাজার হয়ে আবার কালিগঙ্গায় মিলেছে।
কিন্তু দখলদারদের খপ্পরে পড়ে নদীর প্রাণপ্রবাহ প্রায় শেষ! শাখানদীর বিভিন্ন স্থানে নির্মিত হয়েছে প্রায় ১০-১২টি বাঁধ। কোনো বাঁধে স্লুইসগেট থাকলেও সেগুলো দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। এভাবেই ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়েছে ইছামতী। যার কারণে আষাঢ়-শ্রাবণ পার হলেও পদ্মার জল পৌঁছায়নি হরিরামপুরের বৃহৎ ভাতছালা, দিয়ার আর গোপীনাথপুর বিলে। একসময় প্রাণবন্ত এসব বিল এখন পানিশূন্য। শুকনো জমিতে কৃষকরা হতাশ, জেলেরা জাল হাতে বসে আছেন নিরাশ হয়ে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, স্থলভাগসহ নদীর মাঝদিয়ে যাওয়া একাধিক বাঁধের ওপরই গড়ে উঠেছে রাস্তা। কোথাও আবার দোকানপাট, ঘরবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছেন মানুষ। যেমন বাহিরচর পূর্বপাড়া থেকে আন্ধারমানিক-পেঁয়াজচর সংযোগস্থলের বাঁধের ওপর এখন কয়েকটি পরিবার বসতি গড়ে তুলেছে। দোকানঘর ভাড়া দিয়ে ব্যবসাও চলছে। এতে নদীর প্রকৃত প্রবাহ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে গেছে।
আন্ধারমানিক গ্রামের বাসিন্দা শেখ নুরুল বলেন, ‘২৫ বছর আগে পদ্মায় ভিটেমাটি হারিয়ে এখানে আশ্রয় পাই। তখন নদীর বুকে ছিল প্রাণ। এখন নদীতে পানি নেই, জীবন কষ্টে ভরা।’
কৃষক আবদুস সাত্তার ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, ‘বাঁধের কারণে পানি চলাচল বন্ধ। গরু-ছাগল পালন করতে পারি না, পানির জন্যও হাহাকার। বর্ষায় জমে থাকা কচুরিপানা পচে চারপাশে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। তাতে যুক্ত হচ্ছে বসতবাড়ির আবর্জনা, মলমূত্র। এসবের কারণে মশার যন্ত্রণায় টিকে থাকা দায়।’
বাহিরচর গ্রামের মুদিদোকানি জুলমত খাঁ বলেন, ‘২২ বছর আগে ভাঙন রোধে বাঁধ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন একাধিক বাঁধে নদী আটকে গিয়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। শুকনো মৌসুমে তো পানির জন্য আমাদের হাহাকার করতে হয়।’
আগ্রাইল গ্রামের বাসিন্দা ফরিদ আহমেদ খালেক বলেন, ‘একসময়ের প্রবাহমান ইছামতী এখন ভরাট হয়ে মরা নদী। আর নাব্যসংকটে বিলীন হচ্ছে মিঠা পানির মাছ। আমাদের বৃহৎ ভাতছালার বিল এ সময়ে পানিতে টইটম্বুর থাকত। আর এখন বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ হওয়ার কারণে বিলে পানি আসছে না। এতে শত শত কৃষক ও জেলে পরিবার কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।’
পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠন শ্যামল নিসর্গ-এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহিদুল ইসলাম মাহী বলেন, ‘অপরিকল্পিত বাঁধে পানি চলাচল বন্ধ হয়ে কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষ পানির অভাবে হাহাকার করছেন। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। দ্রুত ইছামতী নদী সচল করতে হবে।’
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘ইছামতী নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য আমরা কাজ করছি। স্থানীয়রা নিজেদের সুবিধার্থে যেসব স্থানে বাঁধ নির্মাণ করেছেন, সেগুলো চিহ্নিত করার কার্যক্রমও চলছে। ইতোমধ্যে দুটি বাঁধ চিহ্নিত করা হয়েছে। একটি প্রকল্পের আওতায় বাঁধগুলো অপসারণ করে সেখানে হাইড্রোলিক স্ট্রাকচার স্থাপনের মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।’
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ড. মানোয়ার হোসেন মোল্লা বলেন, ‘বিষয়টি আমি সরেজমিনে গিয়ে পরিদর্শন করেছি। প্রথমে উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলের ফসল বাঁচানোর উদ্দেশ্যেই এসব বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। বর্তমান সমস্যা সমাধানে ইউএনও এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আশা করছি কাজ শেষ হলে আবারও প্রাণ ফিরে পাবে ইছামতী নদী।’