ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী তিতাস নদী দখল-দূষণে এখন অস্তিত্ব সংকটে। এক সময় জেলে জীবিকা ও দেশীয় মাছের ভান্ডার হলেও নদীটি এখন বর্জ্য ও অবৈধ স্থাপনায় জীর্ণ খালে পরিণত হয়েছে। জেলেদের অভিযোগ, নিষিদ্ধ জাল ও দূষণে আগের মতো মাছ মেলে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে তিতাস শুধু অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস ও ঋত্বিক ঘটকের সিনেমাতেই বেঁচে থাকবে।
জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্তত ৭টি উপজেলা দিয়ে বয়ে গেছে তিতাস নদী। নদীর দৈর্ঘ্য ১২৭ কিলোমিটার। জেলা শহরের গোকর্ণ লঞ্চঘাটের পাশেই মালুপাড়ার অবস্থান। এখানে ৭০টির মতো জেলে পরিবারের বসবাস। তিতাস নদীতে মাছ ধরেই চলে তাদের জীবন। যদিও নদীতে আগের মতো মাছ না পাওয়ায় মালুপাড়ার অনেকেই পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন বিভিন্ন পেশায়।
মালুপাড়ার জেলেদের অভিযোগ, অপেশাদার জেলেরা নদীতে কারেন্ট, রিং জাল দিয়ে ছোট ও ডিমওয়ালা মাছ ধরে ফেলেন। যার কারণে নদীতে আশানুরূপ মাছ না পাওয়ায় নৌকার জ্বালানি খরচও উঠে না।
মালুপাড়ার বাসিন্দা নগেন্দ্র চন্দ্র বর্মণ জানান, দখল আর দূষণের কারণে নদীটি সংকুচিত হয়ে পড়েছে। নিষিদ্ধ জাল দিয়ে পোনা মাছ নিধনের কারণে নদীতে আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। আগে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মিললেও এখন তা মিলে না।
গৃহস্থালি ও তীরবর্তী হাটবাজারের বর্জ্য ফেলা হয় নদীতে। নদীর শহরের অংশেই দখল এবং দূষণ সবচেয়ে বেশি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার বর্জ্যযুক্ত পানি ছাড়া হয় নদীতে। ফলে নদীতে দূষণের ঘনত্ব বেড়ে মাছের মড়ক দেখা দেয়। এ ছাড়া নদীর সীমানায় অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলায় সংকুচিত হয়ে পড়েছে নদী। বিশেষ করে জেলা শহরের আনন্দবাজার, মেড্ডা, পাইকপাড়া, কান্দিপাড়াসহ বিভিন্ন অংশে অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। শহরের মতো গ্রামের অংশগুলোতেও নদীর সীমানা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা। এ ছাড়া নিয়মিত ড্রেজিংয়ের অভাবে তিতাসের বিভিন্ন স্থানে নাব্য সংকট তৈরি হয়েছে। এতে করে ব্যাহত হচ্ছে নৌযান চলাচল।
নদী ও প্রকৃতি সুরক্ষা সংগঠন তরী বাংলাদেশের আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, ‘নদীপাড়ের মানুষজনের অসচেতনতা আর পৌরসভার দায়িত্বহীনতায় পৌর এলাকার চারটি বাজারসহ হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা তিতাস নদীকে দূষণ করছে। অন্যদিকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কলকারখানা, হাসপাতাল, পয়ঃবর্জ্যসহ সব বর্জ্য কালন্দিখালসহ একাধিক খাল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে তিতাস নদীকে দূষিত করছে।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আকাশ দত্ত জানান, বিভিন্ন সময় জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যৌথ অভিযানে অনেক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। নদীর সীমানায় আরও যেসব অবৈধ স্থাপনা আছে, সেগুলো উচ্ছেদেও অভিযান চালানো হবে। এ ছাড়া সমন্বিত পানিব্যবস্থা নামে একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে তিতাসসহ আরও কয়েকটি নদী ও খাল খনন করা হবে।