আত্রাই নদীতে একসময় ঢেউয়ের তালে তালে পাল তোলা নৌকা চলত। এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে নদীকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল। নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল শহর-হাটবাজার। কিন্তু এখন সবই অতীত। নদীর অনেক অংশ মরা খালে পরিণত হয়েছে। চৈত্র-বৈশাখে এক ফোঁটা পানিও থাকছে না। ভূ-গর্ভের পানি দিয়ে নদীতীরের ফসলি খেতে সেচ দিতে হয়। কিন্তু কেন এমন হলো? যেখানে মাছ ধরে আগে জেলেরা সংসার চালাতেন- সেখানে কেন চৌচির হওয়া মাটি দেখা যায়?
কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উজানের পানি আটকে দেওয়া, নদীর তলদেশ ভরাট হওয়া ও দখল দূষণের কারণে বরেন্দ্র অঞ্চলের নদ-নদীগুলো প্রাণহীন হয়ে পড়েছে। আরও একটি বড় কারণ রয়েছে। ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়েছে। এই চাপের কারণে নদীর পানি ও ভূগর্ভের পানির মধ্যে থাকা আন্তসম্পর্ক বিঘ্নিত হচ্ছে। এসব কারণে নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। ভরা বর্ষাতেও পানির প্রবাহ থাকে না। কোনো কারণে ঢলের পানি নেমে এলে কিংবা অতিবৃষ্টির কারণে কয়েকদিন পানি থাকলেও তা আবার হারিয়ে যায়। এতে পুরো বরেন্দ্র অঞ্চল মরুকরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি দেশে প্রথমবারের মতো তিনটি অঞ্চলকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে (৪ হাজার ৯১১টি মৌজা) ৪৭টি ইউনিয়নকে (১ হাজার ৫০৩টি মৌজা) অতিউচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বরেন্দ্র অঞ্চলের সবচেয়ে বড় জেলা নওগাঁ। এই জেলার মধ্যদিয়ে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট সাতটি নদী বয়ে গেছে। সবগুলোর অবস্থাই এখন করুণ। জেলার প্রধান নদীগুলো হলো আত্রাই, ছোট যমুনা ও পুনর্ভবা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খরস্রোতা ছিল আত্রাই। সর্পিলাকার এই নদীর উৎপত্তি ভারতের হিমালয় পাদদেশে। দেশটির পশ্চিম দিনাজপুর হয়ে এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
জেলার ধামইরহাট, পত্নীতলা, মহাদেবপুর, মান্দা, আত্রাই ও রানীনগর উপজেলাজুড়ে নদীটি বিস্তৃত। কিন্তু পানির প্রবাহ না থাকায় নদীর তলদেশ ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে যায়। এ কারণে প্রতিবছর খরা মৌসুমের আগেই নদীটি শুকিয়ে যায়। আরেক খরস্রোতা নদী ছিল ‘ছোট যমুনা’। বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুরে এর উৎপত্তি। নওগাঁর ধামইরহাট, বদলগাছী, সদর, রানীনগর ও আত্রাই উপজেলাজুড়ে এটি বিস্তৃত। উজানের পানি প্রত্যাহার (আটকে দেওয়া) ও দখলের কবলে পরে এটি এখন ধুকছে। নদীটিতে বছরের দুই মাসও পানি থাকে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর নাম পুনর্ভবা। এটি আন্তসীমান্ত নদী। এর উৎপত্তি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায়। সেখান থেকে নেমে এসে বাংলাদেশের দিনাজপুর, নওগাঁর সাপাহার ও পোরশা উপজেলা হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে মহানন্দা নদীর মোহনায় মিলিত হয়ে পরে পদ্মা নদীতে মিশেছে। এই নদীটিরও করুণ পরিণতি। উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে বছরের তিন মাসও নদীটিতে পানি থাকে না। সবচেয়ে বেশি দখল ও দূষণের শিকার ছোট যমুনা নদী। দেখভালের অভাবে নদীর পার যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তেমনি পানিপ্রবাহ থেমে গেছে। নদীগুলো দেখতে আর নদীর মতো লাগে না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্য বলছে, বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত অধিকাংশ নদীর উৎস হলো ভারত। উৎসের অববাহিকায় বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার, বৃষ্টিপাত কম হওয়া, পলি জমে তলদেশ ভরাট, ইরিগেশনের সময় ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারসহ জলবায়ুর পরিবর্তন নদীগুলোর অস্তিত্ব সংকটের প্রধান কারণ।
জানা গেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলে গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিমিটার। ১০ বছর আগে বছরে গড় বৃষ্টি হতো ১ হাজার ৫০০ মিলিমিটার। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমার পাশাপাশি কৃষিতে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বছরে এখানে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে প্রায় পৌনে ১ ফুট।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এক কেজি ধান উৎপাদন করতে বরেন্দ্র অঞ্চলে ৬৫০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। এক কেজি ধান থেকে মোটামুটি ৬৬০ গ্রাম চাল পাওয়া যায়। যেখানে একজন বাঙালি ৪০০ গ্রামের মতো ভাত খায়। অর্থ্যাৎ দেড় দিনের ভাতের চাল উৎপাদন করতে স্বাদু বা মিঠা পানির দরকার হয় ৬৫০ লিটার।
ধামইরহাট উপজেলার শীমুলতলী গ্রামের আত্রাই নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা মোবারক হোসেন বলেন, ‘মাত্র ২৫ থেকে ৩০ বছর আগেও আত্রাই নদী ছিল খরস্রোতা। ৯০-এর দশক থেকে নদীটি যৌবন হারাতে থাকে। এখন সরু মরা খালে পরিণত হয়েছে। নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। পানিপ্রবাহ না থাকায় নদীতে মাছ নেই। চৈত্র বৈশাখ-মাসে নদীতে এক ফোঁটা পানিও থাকে না। ভূ-গর্ভের পানি তুলে সেচ দিতে হয়।’
সাপাহার উপজেলার পাতারী গ্রামের চাষি সাইফুদ্দিন সরদার বলেন, ‘সেচের জন্য পোরশা ও সাপাহার এলাকার মানুষ পুনর্ভবা নদী ও জবই বিলের ওপর ৮০ শতাংশ নির্ভর ছিল। এখন নির্ভরতা কমে গেছে। ভূ-গর্ভেও ঠিকমতো পানি পাওয়া যায় না। শুষ্ক মৌসুমে বিশেষ করে চৈত্র-বৈশাখ মাসে বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে পানির জন্য হাহাকার দেখা দেয়।’
জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর ও পত্নীতলা উপজেলার আংশিক এলাকা। সাপাহার উপজেলার কিছু এলাকায় ১৯০ ফুট থেকে ২৫০ ফুট গভীরে পানি পাওয়া যায়। শুষ্ক মৌসুমে পানি মেলে আরও কয়েক ফুট নিচে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নওগাঁ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বরেন্দ্র এলাকায় পানি সংকট তীব্র হচ্ছে। এতে ফসল চাষ কমে যাচ্ছে। পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। উজানে প্রতিবেশী দেশ ভারত নিয়ম না মেনে পানি প্রত্যাহার করছে। মূলত এ কারণেই বরেন্দ্র অঞ্চলের নদীগুলো মরে গেছে। এ ছাড়া অবৈধ দখলের কারণে সেগুলোতে অস্তিত্ব সংকট দেখা দিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘নদীগুলো উদ্ধারে কেউ এগিয়ে আসছে না। ফলে শুধু নদী নয়; গোটা বরেন্দ্র অঞ্চল অর্থাৎ রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে নওগাঁ, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে।’
নওগাঁ সরকারি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, ‘কৃষিকাজে ব্যবহৃত পানির ৯০ শতাংশই ভূগর্ভস্থ। কৃষিতে অতিরিক্ত যে পানি ব্যবহার হচ্ছে তা কমিয়ে আনতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে ব্যবহারের অভ্যাস করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘ভূগর্ভের নিচে পাইরেক্স শিলার অবস্থান। সেখানে ভূগর্ভস্থ পানি থাকে। শুষ্ক মৌসুম এটি নিচের দিকে নেমে যায় এবং বর্ষা মৌসুমে ওপরের দিকে আসে। অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করলে এই শিলাটির পানি শুকিয়ে যাবে। এতে আর্সেনিক নির্গত হবে। ওই পানি ব্যবহার করলে ক্ষতি হবে। তাই ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার কমাতে হবে।’
সাপাহার উপজেলা বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) সহকারী প্রকৌশলী তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘এলাকা ভেদে ভূগর্ভস্থ পানির গভীরতা ১৯০ থেকে ২৫০ ফুট। বেশ কিছু বছর ধরে পানির স্তর নিচে নামছে। ভূগর্ভস্থ পানির সঙ্গে নদীর স্তরের একটা সংযোগ রয়েছে। কোনো কোনো সময় ভূগর্ভস্থ পানি নদীতে আবার নদী থেকে পানি ভূগর্ভস্থ স্তরে রিচার্জ হয়ে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তন ও অনাবৃষ্টির কারণে প্রকৃতির এসব স্বাভাবিক কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে।’