সকালের আলো ফুটতেই নদীর পাড়ে ভিড় করে নৌকা-ট্রলার। জেলেরা ছুটে যাচ্ছে নদী ও সাগরমুখী জলে। জাল ফেলছে, রাত-দিন এক করছে। তবুও জালে উঠে আসছে না কাঙ্ক্ষিত রুপালি ইলিশ। ভরা মৌসুমেও জালে ইলিশ না পড়ায় হতাশায় কাতর ভোলার জেলেরা। শুক্রবার (৩ অক্টোবর) ভোলার চরফ্যাশনের সামরাজ মাছঘাটে গিয়ে দেখা যায়, এক সময়ের ব্যস্ত বাজার এখন নিরব-নিস্তব্ধ। যেখানে গত বছর প্রতিদিন এক থেকে দেড় কোটি টাকার ইলিশ বিক্রি হতো, এবার সেখানে লেনদেন নেমে এসেছে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকায়। ঘাটজুড়ে নেই আগের সেই হাঁকডাক বা কর্মচাঞ্চল্য।
কথা হয় জেলে সাহিন মাঝির সঙ্গে। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ‘মায়ের দোয়া’ নামের ট্রলার নিয়ে ১৮ মাঝিমাল্লাসহ সাগরে গিয়েছিলেন তিনি। দুই লাখ টাকার জ্বালানি ও খাবার খরচ করলেও পাঁচ দিন পর ফিরে ঘাটে ইলিশ বিক্রি করতে পেরেছেন মাত্র দেড় লাখ টাকায়। ভাঙা গলায় বললেন, মাছ পাই না। ঋণের টাকা শোধ করব কিভাবে। সংসারই এখন চালানো দায়।
জেলেদের এই দুর্দশার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরাও। আড়ৎদার মোশারফ হোসেন বলেন, মাছ না থাকলে ঘাটে ব্যবসাও নেই। দাদনের টাকা আটকে আছে। সবাই বিপদে আছি।
এমন পরিস্থিতিতে মরার ওপর খরার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারের ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা। প্রতি বছর অক্টোবরকে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম ধরে ২২ দিনের জন্য মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়। গত বছর নিষেধাজ্ঞা ছিল ১৩ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত। এ বছর সময় এগিয়ে ৪ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে এ কার্যক্রম।
ভোলার ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতির সভাপতি মো. এরশাদ বলেন, “নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা নিয়ে জেলেদের দাবি সরকার নতুন করে বিবেচনা করুক। কারণ গত বছরও নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে প্রচুর ডিমওয়ালা ইলিশ ধরা পড়েছিল।
তবে মৎস্য বিভাগ বলছে, বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভোলা সদর উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মেহেদী হাসান ভূইয়া বলেন, অক্টোবর মাস ইলিশের ডিম ছাড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। ইলিশের বংশবিস্তার রক্ষায় এ সময় মাছ ধরা বন্ধ রাখা জরুরি। এ সময় ইলিশ রক্ষার বিকল্প নেই।
এদিকে নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেরা যাতে খাদ্য সংকটে না পড়েন সেজন্য সরকার ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি নিবন্ধিত পরিবারকে ২৫ কেজি করে চাল বিতরণ করবে বলে জানিয়েছেন ভোলা জেলা প্রশাসক মো. আজাদ জাহান।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভোলায় ইলিশ আহরণ হয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার মেট্রিক টন। এব ছর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন। জেলায় সরকারি নিবন্ধিত জেলে রয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার, এর বাইরে আরও অন্তত ৫০ হাজার অনিবন্ধিত জেলে রয়েছে।
জেলেদের অভিযোগ, ইলিশ ধরা না পড়ায় জীবিকা সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে সরকারের দাবি, টেকসই প্রজনন রক্ষার জন্য নিষেধাজ্ঞা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তাই জেলেদের জীবিকা ও ইলিশ সংরক্ষণ— দুই দিক সমন্বয় করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলে সংগঠনের নেতারা।
ইমতিয়াজুর/মেহেদী/