প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে অসুস্থ গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির চিকিৎসা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় থাকা সরকারি এই সংস্থা থেকে টাকা ছাড়া কোনো সেবা পাওয়া যায় না।
খামারিদের অভিযোগ, কোনো পশু এখানে নিয়ে গেলে আগে চিকিৎসকের সঙ্গে চুক্তি করতে হয়। ন্যূনতম দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা না দিলে তারা পশু দেখতে চান না। এ ছাড়া হাসপাতালে পশু দেখার চেয়ে চিকিৎসকরা বাড়িতে গিয়ে চিকিৎসা দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কারণ হাসপাতালের বাইরে গেলেই তারা মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করার সুযোগ পান। এমন অবস্থায় খামারিদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
তারা বলছেন, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিতে এসে তাদের খালি হাতে ফিরতে হয়। বাধ্য হয়ে তারা পল্লি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। এতে ভুল চিকিৎসায় পশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। যারা সরকারি হাসপালের চিকিৎসককে বাসায় বা খামারে নিয়ে যান, তাদের গুনতে হয়ে কয়েক হাজার টাকা। বিষয়টি সংস্থাটির ঊর্ধ্বতনদের নজরে আনা হলে তারা তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
উপজেলার ছোটখাতা গ্রামের প্রান্তিক খামারি শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার গরুর বাছুরের হার্নিয়া হয়েছে। ডিমলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে (পশু হাসপাতাল) নিয়ে গেলে ভেটেরিনারি সার্জন বলেন- অস্ত্রোপচার করতে হবে। তবে সেটা হাসপাতালে হবে না। আমার বাড়িতে তিনি নিজে গিয়ে অস্ত্রোপচার করে দিতে চেয়েছেন। এ জন্য তাকে খরচ দিতে হবে পাঁচ হাজার টাকা। ভেবেছিলাম সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাব, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই ফিরে আসতে হয়েছে।’
একই এলাকার আরেক খামারি ওলিয়ার রহমান বলেন, ‘গরু অসুস্থ হলে হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার পাই না। পরে তারা ফোন করে বলেন- বাড়িতে গিয়ে দেখবেন। এ জন্য আলাদা টাকা দিতে হবে। টাকা না দিলে তারা আসেন না।’
চরখড়িবাড়ি এলাকার রশিদুল ইসলাম বলেন, ‘বন্যার সময় চর এলাকা থেকে গরু নিয়ে হাসপাতালে আসতে অনেক কষ্ট হয়। কিন্তু হাসপাতালে গেলে ডাক্তার থাকে না। ফিরে গিয়ে দেখি গরু মরে গেছে। আমরা গরিব মানুষ, দুই-তিন হাজার টাকা দিয়ে ডাক্তার আনব কীভাবে?’
আগে থেকে চুক্তি না করলে চিকিৎসক পশু না দেখার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন উপজেলার কুটিরডাঙ্গা এলাকার খামারি সুলতান আলী। এ কারণে তার দুটি গরু মারা গেছে বলে দাবি করেন তিনি। বলেন, ‘প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে বিনা পয়সায় কোনো সেবা পাওয়া যায় না। হাসপাতালে পশু নিয়ে গেলে আগে চিকিৎসকের সঙ্গে টাকার ব্যাপারে চুক্তি করতে হয়।
কমপক্ষে দুই হাজার টাকা না দিলে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক পশু দেখেন না। বাধ্য হয়ে তখন আমরা পল্লি চিকিৎসকের কাছে যাই। তাদের ভুল চিকিৎসার কারণে পশু সুস্থ হওয়ার বদলে আরও অসুস্থ হয়ে যায়। আমার নিজের দুটি গরু ভুল চিকিৎসার কারণে মারা গেছে।’
স্থানীয় খামারিদের অভিযোগ, উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. আসাদুজ্জামান প্রায় সময় হাসপাতালে থাকেন না। সরকারি সেবা বিনা খরচে দেওয়ার বদলে তিনি খামারিদের বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা দেন, দাবি করেন দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা। এমনকি উপজেলা শহরের বিভিন্ন বাজারে তিনি ব্যক্তিগত চেম্বারও চালাচ্ছেন।
বাবুরহাট সদরের খামারি আনিছুর ইসলাম বলেন, ‘পশু হাসপাতালে ওষুধ থাকা সত্ত্বেও আমাদের বাইরে থেকে কিনতে হয়। ঘুষ না দিলে চিকিৎসা মেলে না। এতে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’ প্রান্তিক খামারিরা বলছেন, সরকারি হাসপাতাল মানেই বিনামূল্যের সেবা, কিন্তু বাস্তবে ঘুষ ছাড়া এখানে কোনো চিকিৎসা মেলে না। তাদের দাবি, দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে সরকারি হাসপাতালকে কার্যকর করা হোক।
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ভেটেরিনারি সার্জন ডা. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ শোনেন। তার মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনার সঙ্গে পরে কথা হবে। এখন আমার সামনে স্যার রয়েছেন।’ পরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মদন কুমার রায় বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে সব চিকিৎসা ও অপারেশন বিনামূল্যে হয়। কেউ যদি অর্থ নিয়ে থাকেন সেটা অনৈতিক। এ বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রাশেদুল ইসলামও দিয়েছেন একই আশ্বাস। বলেছেন, ‘লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’