ওষুধ ও জনবলসংকটের কারণে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসক না থাকায় বেশির ভাগ কেন্দ্রের কক্ষ তালাবদ্ধ থাকছে। জ্বর-ঠাণ্ডার ওষুধের জন্য গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে ডিসপেনসারির ওপর ভরসা করতে হচ্ছে। এ ছাড়া সামান্য রোগের জন্য ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিকে। স্বাস্থ্য বিভাগের উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা বলছেন, সংকটের কথা একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ ও ওষুধের সরবরাহ না থাকায় এখনো সমস্যার সমাধান হয়নি। তবে তিনি মনে করেন, শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
সাতকানিয়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সর্বমোট ১৩টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। সেগুলো হলো- চরতি, নলুয়া, আমিলাইশ, এওচিয়া, মাদার্শা, ঢেমশা, পশ্চিম ঢেমশা, কেঁওচিয়া, কালিয়াইশ, ধর্মপুর, পুরানগড়, ছদাহা ও সোনাকানিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র।
জানা যায়, প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা, উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, ফার্মাসিস্ট, নিরাপত্তা প্রহরী ও আয়া থাকার কথা। কিন্তু উপজেলার ১৩টি কেন্দ্রের বিপরীতে আছেন মাত্র ছয় জন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা, তিনজন উপ সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, পাঁচ জন নিরাপত্তা প্রহরী ও সাত জন আয়া। এ ছাড়াও ফার্মাসিস্টের ১৩টি পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
অন্যদিকে, সর্বশেষ ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে এই ১৩ কেন্দ্রের জন্য মাত্র ২০ কার্টন ডিডিএস কিট (ড্রাগ অ্যান্ড ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট কিট) এসেছিল। এরপর থেকে গত এক বছর ধরে সকল ধরনের ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। তবে এসব কেন্দ্রগুলোতে প্রায় দুই মাসের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ও ইমপ্ল্যান্ট মজুত রয়েছে। এ ছাড়াও পর্যাপ্ত পরিমাণে আইইউডি রয়েছে বলে জানা গেছে।
উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ পদ বছরের পর বছর ধরে শূন্য থাকায় কেন্দ্রগুলো প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ওষুধ সরবরাহ বন্ধ থাকায় সেখানে আগত রোগীরা খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। এ ছাড়া বেশির ভাগ কেন্দ্রের ভবনগুলো জরাজীর্ণ। ভবনের অনেক কক্ষ এখন তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে।
ধর্মপুর ইউনিয়নের ফাজর পাড়ার গৃহবধূ কলি আকতার বলেন, ‘আগে এ কেন্দ্রে নিয়মিত চিকিৎসক ও নার্স থাকত। এখন শুধু ভবন আছে, কোনো কার্যক্রম নেই বললেই চলে। সামান্য জ্বর-সর্দিতেও আমাদের পল্লিচিকিৎসক অথবা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হয়। মাঝেমধ্যে পরিবার পরিকল্পনাসংক্রান্ত ওষুধ নিতে গেলে সরবরাহ নেই জানিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আমরা চাই এ কেন্দ্রগুলোতে আবারও নিয়মিত ডাক্তার আসুক, ওষুধ মজুত থাকুক, মাতৃসেবা ও টিকাদান কার্যক্রম স্বাভাবিক হোক। তাহলে গ্রামের মানুষ বেসরকারি হাসপাতালে না গিয়ে এখান থেকেই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারবে।’
পুরানগড় ইউনিয়নের বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বিভিন্ন কেন্দ্রে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা ও উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের পদ শূন্য থাকায় মাতৃস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। নারীদের প্রসবকালীন সেবা দিতে না পারায় অনেক অন্তঃসত্ত্বা ঝুঁকিপূর্ণ প্রসবে বাধ্য হচ্ছেন। কেন্দ্রগুলো পুরোপুরি সচল করতে হলে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ ও ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিতের পাশাপাশি সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত মনিটরিং থাকতে হবে।’
সোনাকানিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘ইউনিয়ন পর্যায়ে এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও টিকা কার্যক্রমের সেবা দেওয়ার কথা। এখান থেকেই গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষরা প্রাথমিক চিকিৎসা ও পরামর্শ পায়। কিন্তু একাধিক সংকটের কারণে কেন্দ্রগুলো এখন নামমাত্র টিকে আছে। স্বাস্থ্যসেবা গ্রামীণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।’
সাতকানিয়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রীতা পাল বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আমরা নিয়মিত জনবল ও ওষুধ সংকটের বিষয়টি জানিয়ে আসছি। কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ ও ওষুধের সরবরাহ না থাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। সম্প্রতি আমাদের কেন্দ্রগুলোর জন্য কিছু ওষুধ পাঠানোর কথা থাকলেও সেগুলো এখন পর্যন্ত আসেনি। ফলে মাঠপর্যায়ের কেন্দ্রগুলোতে কাজ চালিয়ে নিতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। তবে আশা করছি শিগগিরই সংকট কেটে যাবে।’