নদীর তাজা মাছের গন্ধ আর ক্রেতা-বিক্রেতার কোলাহলে প্রতিদিন ভোরে মুখরিত হয়ে ওঠে গ্রাম্য বাজার। অসংখ্য পুরুষ ব্যাপারীর ভিড়ে এই বাজারের পরিচিত মুখ হলেন শারীরিক প্রতিবন্ধী রোকেয়া বেগম। মেঘনা নদীর মাছের মতো তার জীবনও যেন নদীর ঢেউয়ের মতোই চঞ্চল, তবে তার সংগ্রাম স্থির ও দৃঢ়। শরীরের প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও জীবিকার তাগিদে এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে প্রতিদিন সকাল হতে না হতেই তাজা মাছের ডালি নিয়ে তিনি হাজির হন জনবহুল বাজারে।
নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার সোনাদিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম চরচেঙ্গা গ্রামের হাদিয়ার রহমানের মেয়ে রোকেয়া বেগম। ৫০ বছর বয়সে তার উচ্চতা মাত্র সাড়ে তিন ফুট। এক ছেলে, ভাইয়ের মেয়েসহ সাতজনের সংসার তার। স্বামী ১৫ বছর আগে ছেড়ে চলে গেছে। সংসারের ভার এসে পড়েছে তার কাঁধেই। ভোর হওয়ার আগেই কষ্ট করে রোকেয়া বেগমকে ছুটতে হয় ঘাটে। তার শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জেলেদের কাছ থেকে সরাসরি মাছ সংগ্রহ করে বাজারে পৌঁছানোই তার দৈনিক রুটিন। তার এই পরিশ্রমী যাত্রা কেবল একজন মাছ বিক্রেতার গল্প নয়; এটি শারীরিক প্রতিকূলতাকে জয় করে গ্রামীণ অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে একজন নারীর আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার এক অনুপ্রেরণামূলক উপাখ্যান।
স্থানীয়রা জানান, এই বাজারে দীর্ঘদিন ধরে মাছ বিক্রি করছেন রোকেয়া। এই দীর্ঘ পথচলায় তার মূল পুঁজি হলো কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য ও সততা। সমাজের নানা বাধা এবং প্রতিকূলতা, বিশেষ করে শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে উপেক্ষা করে তিনি প্রমাণ করেছেন—পরিশ্রমের মাধ্যমেই জীবনে সফলতা অর্জন করা যায়।
প্রতিদিন মাছ বিক্রি করে পাওয়া ২০০–৩০০ টাকা দিয়েই তিনি সংসারের ব্যয় নির্বাহ করেন। ঝড়-বৃষ্টির দিনে মাঝে মধ্যে উপার্জন বন্ধ থাকে। তখন খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে। তবুও তার ইচ্ছাশক্তি অটুট। সরকারি আর্থিক সহযোগিতা পেলে নিজের ব্যবসার পরিধি আরও একটু বাড়ানোর ইচ্ছা রয়েছে তার। তাতে পরিবার-পরিজন নিয়ে বাকি জীবনটা সুন্দরভাবে কাটবে— এই আশাই করেন তিনি।
রোকেয়া বেগম আজ কেবল একজন মাছ বিক্রেতা নন; তিনি নোয়াখালীর হাতিয়া অঞ্চলের নারীদের কাছে এবং সব শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের কাছে এক উজ্জ্বল প্রেরণার প্রতীক।
হানিফ/মেহেদী/