মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ সড়ক গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে সংস্কারের অপেক্ষায় পড়ে আছে। নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ না হওয়ায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে পুরো প্রকল্পটি। কাজের গুণগত মান নিয়ে ওঠা অভিযোগ গড়িয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পর্যন্ত। এর খেসারত দিতে হচ্ছে স্থানীয় সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে রোগী পরিবহন করতে গিয়ে গ্রামবাসী প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
সিংগাইর উপজেলার জামশা ইউনিয়নের বাংগালা বাজার থেকে মাটিকাটা পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি ওই এলাকার কয়েকটি গ্রামের প্রধান যোগাযোগমাধ্যম। প্রতিদিন হাজারও মানুষ, শিক্ষার্থী, কৃষিপণ্যবাহী ও রোগীবাহী যানবাহন এই সড়ক ব্যবহার করে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে খানাখন্দে ভরা ও ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে থাকায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে স্থানীয়দের।
এই বেহাল অবস্থা কাটাতে ২০২৩–২৪ অর্থবছরে গ্রামীণ সড়ক মেরামত ও সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় সড়কটির সংস্কার কাজ হাতে নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে প্রায় ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়কটির সংস্কার কাজের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নির্মাণ প্রকৌশলী।
চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যেই কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাজ শুরুর পরপরই সড়কের দুপাশের এজিংয়ে পুরোনো ইটের সঙ্গে নতুন ইট ব্যবহার করে ব্রিক স্যালভেজ করায় গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব অভিযোগ একপর্যায়ে দুর্নীতি দমন কমিশন পর্যন্ত গড়ালে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এর পর দেড় বছরের বেশি সময় পার হলেও আর নতুন করে কাজ শুরু হয়নি।
এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রোগী পরিবহনে। স্থানীয়রা জানান, অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে গিয়ে অটোরিকশা ও ভ্যান উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বর্ষা মৌসুমে কাদা-পানিতে রাস্তা প্রায় চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে।
অটোরিকশাচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এই রাস্তায় গাড়ি চালাতে গিয়ে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়। একটু ভুল হলেই গাড়ি উল্টে যায়। রোগী থাকলে তো আরও বেশি ভয় লাগে।’
আরেক চালক আব্দুল মালেক বলেন, ‘দেড় বছর ধরে রাস্তার কাজ বন্ধ। টানা কয়েক মাস গাড়ি চালালে গাড়ির চাকা-সকেটজাম্পার নষ্ট হয়ে যায়। যে টাকা আয় হয়, তার অর্ধেকই গাড়ি মেরামতে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু যাত্রী না নিলে সংসার চলবে না।’
পথচারী হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোই এখন বড় ঝামেলা। বর্ষার সময় হেঁটে চলাই কষ্টকর। এই সড়কের কাজ পাঁচ মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে সেটা দেড় বছরেও শেষ হয়নি। কবে হবে তাও জানি না। সরকারের টাকা কোথায় গেল, সেটাই জানতে চাই।’
স্থানীয় গৃহবধূ নাজমা খাতুন বলেন, ‘হঠাৎ কেউ অসুস্থ হলে ভ্যান বা অটোরিকশায় তুলতেই ভয় লাগে। এই চার কিলোমিটার সড়ক যেতে সময় লাগার কথা ১৫ মিনিট, কিন্তু লাগে প্রায় ৩৫-৪০ মিনিট। রাস্তা ভালো না থাকায় ঝাঁকুনিতে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়।’
এদিকে কাজ বন্ধ থাকার পরও মাত্র ২৬ শতাংশ কাজ করে প্রায় ৮০ লাখ টাকার বিল তুলে নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে ঠিকাদার আবু সাঈদ খান বলেন, ‘কিছু কারিগরি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কাজ বন্ধ ছিল। সমস্যাগুলোর সমাধান হয়েছে। খুব শিগগিরই আবার কাজ শুরু হবে। শুরুর এক মাসের মধ্যে এই রাস্তা মেরামত করা হবে।’
এলজিইডি মানিকগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী এ বি এম খোরশেদ আলম বলেন, ‘গুণগত মান নিয়ে অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে দ্রুত সময়ের মধ্যেই সড়কটির কাজ পুনরায় শুরু করা হবে। আশা করা হচ্ছে, এক সপ্তাহের মধ্যেই কাজ শুরু করা হবে।’