মাগুরায় গরুচোর সন্দেহে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত বুধবার সকালে মাগুরা সদর উপজেলার ইছাখাদা বাজারে সংঘটিত এ ঘটনায় নিহত হন মো. আকিদুল (৪২)। তিনি সদর উপজেলার পাকা কাঞ্চনপুর গ্রামের শহর আলীর ছেলে।
ঘটনার দুই দিন পর গতকাল শুক্রবার নিহতের ছেলে মো. চান মিয়া বাদী হয়ে মাগুরা সদর থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। তবে মামলা দায়েরের পরও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
মাগুরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশিকুর রহমান মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, নিহতের ছেলে বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেছেন। তদন্ত চলছে, তবে এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
তিনি জানান, ঘটনার আগের দিন বৃহস্পতিবার সম্রাট নামের এক ব্যক্তি থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে গরু চুরির অভিযোগে একটি মামলা করেন। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া একটি গরু ওই ব্যক্তির জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্যমতে, বুধবার ভোরে ইছাখাদা বাজার এলাকায় আকিদুলকে গরুচোর সন্দেহে স্থানীয় লোকজন আটক করে। পরে তাকে ঘিরে ধরে গণপিটুনি দেওয়া হয়। সকাল ৯টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তাকে উদ্ধার করে মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তবে নিহতের পরিবার এ ঘটনাকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করছে।
নিহতের স্ত্রী অজিফা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, তার স্বামী ওই দিন ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। আমার স্বামী যে ঢাকা থেকে আসছিল, তা তার মোবাইল ফোনের সিম লোকেশন বের করলেই প্রমাণ হবে বলেন তিনি।
তার অভিযোগ, বাজারে ধরে নেওয়ার পর কয়েকজন ব্যক্তি ফোন করে তাকে টাকা দাবি করেন। মনিরুল নামে এক ব্যক্তি আমার স্বামীর মোবাইল ফোন থেকে ফোন করে বলে, ‘তোমার স্বামী গরু চুরি করেছে। দুই লাখ টাকা দিলে ছেড়ে দেব।’
টাকা দিতে না পারায় তাকে কাঁঠালগাছের সঙ্গে বেঁধে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, অভিযোগ করেন অজিফা খাতুন।
নিহতের পরিবারের আরও অভিযোগ, তারা থানায় সুনির্দিষ্ট কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করতে চাইলেও পুলিশ অজ্ঞাত আসামির কথা উল্লেখ করতে বলে। যদিও পুলিশ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইছাখাদা নতুন বাজার বণিক সমিতির সভাপতি মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে সকাল ৮টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি অনেক মানুষ ভিড় করে আছে। পুলিশ পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
তিনি জানান, কয়েক মাস আগে স্থানীয় একজন ব্যবসায়ীর তিনটি গরু চুরি হয়েছিল। সে কারণে এলাকায় গরু চুরি নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। গরু চোর ধরা পড়েছে—এমন খবর শুনে অনেক মানুষ জড়ো হয়, বলেন তিনি।
মাগুরায় এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। গত বছরের গত ১০ আগস্ট সদর উপজেলার আলাইপুর গ্রামে চুরির অভিযোগে সজল হোসেন (২৩) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৭ হাজার টাকা চুরির সন্দেহে তাকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় নিহতের বাবা মো. শরিয়ত মোল্লা হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ৪২ জনকে আসামি করা হলেও পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত শেষ হয়নি। এখন পর্যন্ত মাত্র দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এ ছাড়া গত ১৬ সেপ্টেম্বর মহম্মদপুর উপজেলার জাঙ্গালিয়া গ্রামে মো. ইসরাফিল (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে মুঠোফোন ও নগদ টাকা চুরির অভিযোগে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় ২৮ জনকে আসামি করে মামলা হলেও এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। পুলিশ জানায়, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়ায় তদন্তে বিলম্ব হচ্ছে।
নিহত ইসরাফিলের পরিবারের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঘটনার দিন পুলিশ দেরিতে এসেছে। এখনো মামলার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। আমরা ভয়ে কিছু বলতেও পারছি না। কেউ চোর হলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।
একাধিক গণপিটুনির ঘটনায় মানুষ হত্যা হলেও দীর্ঘদিন তদন্ত শেষ না হওয়া ও আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় মাগুরায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সচেতন মহল বলছে, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের আইনের আওতায় না আনলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হবে।
শ্রাবণ/মাহফুজ