নৌপথে এসে ডাকাতি করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়া ডাকাত দলের হাত থেকে বাঁচতে অভিনব এক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রামবাসীর স্বেচ্ছাশ্রমে নদীর মাঝ বরাবর বাঁশের বেড়া দিয়ে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে গ্রামবাসী ‘নিরাপদ’ বোধ করলেও তাদের অজান্তে মৎস্য ও কৃষি খাতের সুদূরপ্রসারী ক্ষতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ বেড়ার কারণে নদীর পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। এতে আশপাশের জমিতে জলাবদ্ধতা দেখা দেবে। সে ক্ষেত্রে কৃষিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। এ ছাড়া মাছের অবাধ চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার পাশাপাশি জলজ জীববৈচিত্র্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এলাকাবাসী বলছেন, পুলিশ-প্রশাসনকে বারবার বলেও প্রতিকার না পেয়ে তারা বাধ্য হয়ে এমন উদ্যোগ নিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার দিলপাশার ইউনিয়নের বেতুয়ান গ্রামসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে নৌপথে ডাকাতদের তাণ্ডব চরমে পৌঁছেছে। সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি থেকে নাটোর-রাজশাহী পর্যন্ত বিস্তৃত বড়াল নদীকে ডাকাত দল নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। কয়েক বছর ধরে এ এলাকায় ডাকাতি করে তারা স্পিডবোট কিংবা দ্রুতগতির নৌকায় করে পালিয়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় বেতুয়ান গ্রামের বাসিন্দারা বড়াল নদীতে বাঁশের বেড়া স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন।
গ্রামবাসী জানান, কিছুদিন আগে অষ্টমনিষা এলাকায় পাঁচটি স্বর্ণের দোকান লুট করে ডাকাত দল স্পিডবোটে করে পালিয়ে যায়। গত সপ্তাহে ডাকাত দল এলে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে তাদের প্রতিহতের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ডাকাতদের কাছে অস্ত্র থাকায় তারা শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যায়। এ ছাড়া বেতুয়ান গ্রাম থেকে দুটি মহিষ ও একটি গরু চুরি করা হয়। এর আগেই গ্রামটিতে প্রকাশ্যে গবাদিপশু লুট করা হয়েছিল।
গ্রামবাসী জানান, এ নদীপথে ডাকাতদের ধরতে গিয়ে অতীতে অনেক মানুষ জখম হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। এমনকি দেড় বছর আগে ধাওয়া খেয়ে পালানোর সময় তিন ডাকাতকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য আরজু খান বলেন, ‘ডাকাতরা দ্রুতগামী নৌকা ও মরণাস্ত্র নিয়ে আসে। ধাওয়া করলেও নৌকা না থাকায় মাঝ নদী থেকে তাদের ধরা সম্ভব হয় না।’
বেতুয়ান গ্রামের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের গ্রাম থেকে সম্প্রতি দুটি মহিষ ও একটি গরু নিয়ে গেছে। নিরাপত্তা বাড়াতে আমরা নিজেরাই নদীর মাঝে এ বেড়া দিয়েছি।’ একই গ্রামের গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘রাতের আঁধারে নৌকা নিয়ে চোর প্রবেশের ভয় এখন অনেকটা কেটে গেছে।’ নাসরীন খাতুন নামে এক নারী বলেন, ‘গ্রামের সবাই মিলে এ কাজে অংশ নিয়েছে। আমাদের নিরাপত্তার স্বার্থে এটি জরুরি ছিল।’
বেতুয়ান গ্রামের বাসিন্দা শাকিল হোসেন খান বলেন, ‘পুলিশকে খবর দিলে গ্রামে পৌঁছাতে তাদের যে সময় লাগে ততক্ষণে ডাকাত দল পালিয়ে যায়। পুলিশি নিরাপত্তার অভাবেই গ্রামবাসী নিরুপায় হয়ে বড়াল নদীতে বাঁশের বেড়া দিয়েছে। এতে নৌপথ সংকুচিত হওয়ায় ডাকাত দল গ্রামে ঢুকতে পারছে না। জীববৈচিত্র্য রক্ষার চেয়ে গ্রামবাসী এখন নিজেদের জানমাল রক্ষাকে বেশি জরুরি মনে করছেন।’
পরিবেশবিদরা বলছেন, এ বেড়ার কারণে নদীর পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। পার্শ্ববর্তী কৃষি জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়া এবং চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। মাছের অবাধ চলাচল এবং জলজ জীববৈচিত্র্যও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
পাবনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা দীপক কুমার পাল বলেন, ‘নদীতে কৃত্রিম বাধা দিলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র নষ্ট হয়। এটি মৎস্য সম্পদের জন্য হুমকিস্বরূপ।’ অন্যদিকে নদীতে বাঁশের বেড়া দেওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. নাজমুল ইসলাম। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বা প্রবাহ রোধ করা মানেই সেখানকার সামগ্রিক বাস্তুসংস্থান নষ্ট করা। কৃত্রিমভাবে তৈরি এ প্রতিবন্ধকতা নদীর পানি প্রবাহকে ব্যাহত করে, যা ভবিষ্যতে ওই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করতে পারে। এটি শুধু পরিবেশের জন্যই নয়, স্থানীয় কৃষি ও জলজ প্রাণীর জন্যও ক্ষতির কারণ হতে পারে।’
ভাঙ্গুড়া থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, নৌপথে চুরি-ডাকাতির ঘটনায় গ্রামবাসীর মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছিল। সেই আতঙ্ক থেকেই তারা নদী বরাবর বেড়া দেওয়ার এ উদ্যোগ নিয়েছেন।