বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমানের (লিংকন) মুক্তি চেয়ে তার বিরুদ্ধে হওয়া মামলা প্রত্যাহারের দাবি তুলেছেন বরিশালের আইনজীবীরা। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট বিচারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলা হয়েছে। এ জন্য গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে জেলার সব আইনজীবী আদালত বর্জন করেন। এতে বিচারকার্য ব্যাহত হওয়ায় বিচারপ্রার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
এদিকে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এজলাসে ভাঙচুর ও বিচারকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের ঘটনায় ৯ আইনজীবীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি অবমাননার অভিযোগে ১২ আইনজীবীর সনদ বাতিলের আবেদন সুপ্রিম কোর্টে পাঠিয়েছে তদন্ত কমিটি।
আইনজীবীরা জানান, গত সোমবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুসকে একটি মামলায় আদালত জামিন দেন। ওই জামিন আদেশের প্রতিবাদে মঙ্গলবার সকাল থেকে মুখ্য মহানগর হাকিম ও অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত বর্জন করে বিক্ষোভ করেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা।
বিক্ষোভ শেষে দুপুরে আদালতের এজলাসে হট্টগোল ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। এ সময় বিচারক এস এম শরিয়তুল্লাহ এজলাস ত্যাগ করেন। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজিব মজুমদার বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। এতে সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকনকে প্রধান আসামি করে ১২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের আহ্বায়ক ও মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি নাজিমউদ্দিন আহমেদ পান্না বলেন, ‘গতকাল দুটি আদালত বর্জন করা হয়েছিল। আজ (বৃহস্পতিবার) থেকে বরিশালের সব আদালতে এই কর্মসূচি চলছে।’ বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বড় মঙ্গলের জন্য ছোট ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিতে হয়।’
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্যসচিব আবুল কালাম আজাদ ইমন জানান, তাদের তিনটি দাবি—সভাপতির মুক্তি, মামলা প্রত্যাহার এবং এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই বার ও বেঞ্চের সম্পর্ক অটুট থাকুক। তবে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে।’
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের এপিপি সাঈদ চৌধুরী বলেন, ‘সভাপতিকে তার কার্যালয় থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আদালত বর্জন চলবে।’
এদিকে নিয়মিত হাজিরা ও মামলার শুনানির জন্য আইনজীবীরা এজলাসে উপস্থিত না থাকায় অনেক বিচারপ্রার্থী আদালত চত্বরে এসে ফিরে যান। ঢাকা থেকে হাজিরা দিতে আসা মো. মনির বলেন, ‘উজিরপুর আদালতে একটি হত্যাচেষ্টার অভিযোগে হওয়া মামলায় শেষ হাজিরা দেওয়ার কথা ছিল। মামলাটি আজই নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। এতে করে আমরা বিপদে পড়ব।’
জেলার বানারীপাড়া উপজেলার সৈয়দকাঠি থেকে আসা শাজাহান সরদার বলেন, ‘সাকসেশন মামলার (সম্পদ সংশ্লিষ্ট দেওয়ানি মামলা) আজ ফাইনাল শুনানির কথা ছিল। কিন্তু উকিলরা আদালত বর্জন করায় শুনানি হয়নি। আগামী রবিবার শুনানি না হলে আমাদের পরিবারকে বড় বিপদে পড়তে হবে।’
উজিরপুর থেকে আসা মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘জমিসংক্রান্ত একটি মামলার নিষ্পত্তি হওয়ার কথা ছিল। অ্যাডভোকেটরা আদালত বর্জন করায় মামলাটি নিষ্পত্তি হলো না। এক মাস পিছিয়ে গেলাম।’
অন্যদিকে আদালত অবমাননার ঘটনায় বুধবার উচ্চ আদালতের বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন। রুলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের ১০ দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শফিকুর রহমান।
মামলার আসামিরা হলেন বরিশাল আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও বিএনপি নেতা সাদিকুর রহমান (লিংকন), সাধারণ সম্পাদক মীরজা রিয়াজুল ইসলাম, জেলা পিপি আবুল কালাম আজাদ, মহানগর আদালতের পিপি নাজিমুদ্দিন পান্না। অন্য আসামিরা হলেন মহসিন মন্টু, মিজানুর রহমান, আব্দুল মালেক, সাঈদ, হাফিজ উদ্দিন বাবলু, তারেক আল ইমরান, আবুল কালাম আজাদ ইমন, বশির উদ্দিন সবুজ এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৫-২০ জন।
মামলায় বলা হয়েছে, একটি মামলার জামিনকে কেন্দ্র করে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সামনে সকাল ১০টা ৪৫ মিনিট থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত আসামিরাসহ আনুমানিক ১৫-২০ জন আইনজীবী চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এবং অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত বর্জন ঘোষণা করে বিচারকদের উদ্দেশে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেন। তারা বিচারকদের উদ্দেশ করে বিভিন্ন আপত্তিকর স্লোগান দেন। এরপর বেলা আড়াইটায় আদালতের কার্যক্রম চলাকালীন তারা হট্টগোল করেন। এতে আদালতের পরিবেশ বিঘ্নিত হয়।