বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় অনুষ্ঠিত হলো প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী দোলযাত্রা ও দোলের মেলা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা হাজারও দর্শনার্থী ও ভক্তদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ির মেলা প্রাঙ্গণ জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
গত বুধবার সন্ধ্যায় নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণে শ্রীকৃষ্ণের দোলমূর্তি আনা হলে শুরু হয় উৎসবের মূল আয়োজন। পরে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে উৎসব আরও জমে ওঠে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আমন্ত্রিত ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের দোলমূর্তি সিংহাসনে তুলে কাঁধে করে ঢাক-ঢোলের তালে তালে নৃত্য করতে করতে মেলা প্রাঙ্গণে নিয়ে আসেন। এতে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ব্যাপক সমাগম ঘটে।
প্রতিবছরের মতো এবারও বিভিন্ন গ্রাম থেকে মোট ৪৬টি দোলমূর্তি মেলায় আনা হয়। ছোট দোলমূর্তি চারজন এবং বড় দোলমূর্তি ৮ থেকে ১০ জন ভক্ত কাঁধে বহন করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঢাক-ঢোলের বাজনায় পৌরাণিক নৃত্যের তালে মেলা প্রাঙ্গণে ঘুরে বেড়ান। ভক্তরা পরিবারসহ ভক্তিময় পরিবেশে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত উৎসব উপভোগ করেন।
আয়োজকরা জানান, বাংলা ১৩০৪ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর নাওডাঙ্গা জমিদার পরিবারের সদস্যরা ভারতের কোচবিহারে চলে যান। এরপরও স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতিবছর জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণে জাঁকজমকপূর্ণভাবে দোল উৎসব ও মেলার আয়োজন করে আসছেন।
তিন দিনব্যাপী দোল উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় সোমবার রাতে ‘ন্যাড়া পোড়ানো’র মধ্য দিয়ে। মঙ্গলবার উপজেলার বিভিন্ন মন্দিরে পূজা, হোমযজ্ঞ ও প্রসাদ বিতরণসহ নানা ধর্মীয় রীতি পালন করা হয়। ভক্তরা রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহে আবির অর্পণ করে দোলযাত্রার আনন্দে অংশ নেন এবং সংসারের সুখ-শান্তি কামনায় প্রার্থনা করেন।
বুধবার সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় দোলমূর্তি নিয়ে ভক্তরা নিমন্ত্রণ পালনে বের হন। যেসব বাড়িতে দোলমূর্তি নেই, সেখানে গিয়ে পূজা-অর্চনা ও বরণ করা হয়। সন্ধ্যার পর সব সওয়ারি নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ির দোল মেলায় অংশ নেয়।
চট্টগ্রাম থেকে আসা শিক্ষিকা বৃষ্টি চৌধুরী বলেন, পত্রিকায় রংপুর অঞ্চলের দোল উৎসব সম্পর্কে জেনে এখানে আসার ইচ্ছা ছিল। এবার সেই ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। উৎসবের জাঁকজমক দেখে তিনি মুগ্ধ হন।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট থেকে আসা দর্শনার্থী অভিজিৎ চন্দ্র জানান, শৈশবকাল থেকেই তিনি এই দোল উৎসবে অংশ নিচ্ছেন। এখানে এলে মন প্রশান্তিতে ভরে ওঠে।
কথা হয় দোলের মেলা উদযাপন কমিটির সভাপতি শুশীল কুমার রায় ও সাধারণ সম্পাদক রতন চন্দ্র রায়ের সঙ্গে। তারা জানান, প্রায় তিনশ বছরের ঐতিহ্যবাহী এ উৎসব দর্শনার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও প্রশাসনের সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার রাত ১২টার দিকে দোলমূর্তিগুলোকে বিদায় জানানো হয় এবং মেলায় দোকানপাটে রাত দেড়টা পর্যন্ত বেচাকেনা চলে। বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ‘বাসি মেলা’ অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি কার্তিক চন্দ্র সরকার জানান, নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ির পাশাপাশি ফুলবাড়ী সদর ও ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের রাবাইটারী এলাকায় ছোট ও মাঝারি পরিসরে আরও কয়েকটি দোল উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ফুলবাড়ী থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আব্দুল মালেক জানান, দোল উৎসব উপলক্ষে পুলিশ, গ্রাম পুলিশ ও মেলা কমিটি সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করায় পুরো আয়োজন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। হাজারো দর্শনার্থী নিরাপদ পরিবেশে উৎসব উপভোগ করেছেন।