পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে শুরু হয়েছে ঘরমুখী মানুষের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা যাত্রা। রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছুটছেন মানুষ। তবে এবারের ঈদযাত্রায় আনন্দের পাশাপাশি ভর করেছে অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর রাজশাহীতে দেখা দিয়েছে ফিরতি যাত্রার টিকিটসংকট, যার মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জ্বালানি তেলের ঘাটতির আশঙ্কা।
রাজশাহী নগরীর শিরোইল এলাকায় দূরপাল্লার বাস কাউন্টারগুলো ঘুরে জানা গেছে, বেশির ভাগ কাউন্টারে ঢাকাগামী কোনো টিকিট বিক্রি হচ্ছে না। কিছু কিছু কাউন্টারে সীমিতসংখ্যক টিকিট দেওয়া হলেও সেখানে আরোপ করা হচ্ছে বিশেষ শর্ত, যদি পর্যাপ্ত জ্বালানি পাওয়া না যায়, তাহলে যাত্রা বাতিল হতে পারে। এই শর্তে টিকিট নিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক যাত্রী, যা তাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলছে।
বাস কাউন্টারসংশ্লিষ্টরা জানান, জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় তারা আগাম টিকিট বিক্রি করতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনে সীমিতসংখ্যক টিকিট ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। যাত্রীদের সেখান থেকে টিকিট সংগ্রহের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে সেসব টিকিটও দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে ট্রেনযাত্রায় এখনো তেমন কোনো অনিশ্চয়তা দেখা যায়নি। ফলে অনেক যাত্রীই বিকল্প হিসেবে রেলপথে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। তবে ট্রেনের টিকিটও সীমিত হওয়ায় সেখানে চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেকে বলছেন, স্বাভাবিক সময়েই ট্রেনের টিকিট পাওয়া যায় না, ঈদের সময় তো তা সোনার হরিণ হয়ে ওঠে।
জানা গেছে, ১৫ মার্চ থেকে রাজশাহীমুখী যাত্রীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ঈদের আগ পর্যন্ত এই চাপ অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর ঈদের পরের দিন থেকেই শুরু হবে ঢাকামুখী যাত্রা। ঠিক সেই সময়েই ফিরতি টিকিট নিয়ে অনিশ্চয়তা সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
ইতোমধ্যে কিছু বাস কোম্পানি জ্বালানিসংকটের কারণে নির্ধারিত যাত্রা বাতিল করেছে বলে জানা গেছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। অনেকেই বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে বাধ্য হয়েছেন।
পরিবহনসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও নাটোর হয়ে ঢাকাগামী বাসগুলো চলাচল করে থাকে। এসব রুটে চলাচলকারী বেশ কয়েকটি পরিবহন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জ্বালানি পাম্প থাকলেও সেখানেও পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। যেমন: রাজশাহীতে দেশ ও ন্যাশনাল ট্রাভেলসের নিজস্ব পাম্প রয়েছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে রয়েছে গ্রামীণ ট্রাভেলসের পাম্প এবং ঢাকার সাভার ও মহাখালী এলাকায় হানিফ, শ্যামলী ও একতা পরিবহনের পাম্প রয়েছে। তবুও জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি থাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
পরিবহন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একটি নন-এসি বাসের চাঁপাইনবাবগঞ্জ-ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে যাতায়াতে প্রায় ১৮০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। আর এসি বাসের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ২০০ থেকে ২৩০ লিটার পর্যন্ত। কিন্তু বর্তমানে ডিপো থেকে যে পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে, তা দিয়ে ২৪ ঘণ্টায় মাত্র সীমিতসংখ্যক বাস চলাচল করতে পারছে। অনেক ক্ষেত্রেই পুরো ট্যাংক ভর্তি করা যাচ্ছে না। ফলে বাস চলাচল কমিয়ে দিতে হচ্ছে।
রুহুল আমিন নামের এক যাত্রী বলেন, ‘রাজশাহী আসার সময় কোনো সমস্যা হয়নি, কিন্তু ফেরার টিকিট পাচ্ছি না। সামনে আমার পরীক্ষা, সময়মতো ফিরতে না পারলে বড় সমস্যায় পড়ব।’
আরেক যাত্রী রিয়াদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবছর আমরা যাওয়া-আসার টিকিট একসঙ্গে কেটে রাখি। কিন্তু এবার কাউন্টার থেকে বলা হচ্ছে ফিরতি টিকিট এখন দেওয়া যাবে না। এতে খুব দুশ্চিন্তায় আছি।’
পরিবহনসংশ্লিষ্টদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে একই চিত্র। একতা ট্রান্সপোর্টের বুকিং কর্মকর্তা গোলাম মর্তুজা বলেন, ‘নিয়মিত যাত্রীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার চেষ্টা থাকলেও জ্বালানিসংকটের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক যাত্রী জোরাজুরি করায় শর্তসাপেক্ষে টিকিট দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু টিকিট অনলাইনে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’
ন্যাশনাল ট্রাভেলসের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোয়ালেম হোসেন বলেন, ‘আগের বছরগুলোতে যাত্রীরা যাওয়া-আসার টিকিট একসঙ্গে কিনতেন। কিন্তু এবার জ্বালানিসংকটের আশঙ্কায় রিটার্ন টিকিটের আগাম বুকিং বন্ধ রাখা হয়েছে। নিজস্ব পাম্প থাকলেও পর্যাপ্ত জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না।’
গ্রামীণ ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপক হাসানুজ্জামান সম্রাট জানান, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হলে আবার টিকিট বিক্রি শুরু করা হবে। তখন যাত্রীরা কাউন্টার থেকেই ফিরতি টিকিট সংগ্রহ করতে পারবেন।
এ বিষয়ে রাজশাহী পরিবহন মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা আশা করছি সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রেখেই ঈদযাত্রা সম্পন্ন হবে। তবে জ্বালানি সরবরাহে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। দ্রুত এই সমস্যা সমাধান হলে যাত্রীদের ভোগান্তি কমবে।’