ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি রোগীর চাপে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। শয্যা না পেয়ে অনেক রোগীকে দিনের পর দিন চিকিৎসার জন্য বারান্দায় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এমনকি দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তিরাও এসব ক্ষেত্রে ছাড় পাচ্ছেন না। অনেকের শরীরের জখম হওয়া অংশে সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে। তারপরও তারা চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। তুলনামূলক সচ্ছলরা বেসরকারি হাসপাতালে ছুটলেও নিম্ন আয়ের মানুষদের এখানেই অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতির জন্য কর্তৃপক্ষ জনবল সংকট ও রোগীর চাপকে দায়ী করছেন। তবে অধিকারকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের দাবি সত্ত্বেও রামেকে মানুষের মৌলিক অধিকার চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যায়নি। কিছু ক্ষেত্রে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে নিতে ঢিমেতালে চিকিৎসা দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় পা ভাঙা রাজশাহীর জোদকাদিরপুর গ্রামের ভ্যানচালক আলমগীর হোসেন গত রবিবার হাসপাতালে ভর্তি হন। কিন্তু অর্থোসার্জারি বিভাগের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে তিনি শয্যা পাননি। শেষ মুহূর্তে ঠাঁই হয়েছে বারান্দায়। মেঝেতে শুয়ে তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তিনি বলেন, ‘তিন দিন ধরে অপারেশনের অপেক্ষায় আছি, কিন্তু এখনো হয়নি। কবে হবে তাও জানি না।’
একই বারান্দায় শুয়ে আছেন নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার ইজিবাইক চালক আবু বকর। ১০ দিন আগে দুর্ঘটনায় পা ভাঙার পর প্রথমে রামেক হাসপাতালে ভর্তি হলেও পরে এক চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি বাড়ি ফিরে যান। পরে সংক্রমণ বাড়ায় দুদিন পর আবার হাসপাতালে ভর্তি হতে বাধ্য হন। পায়ে রড ও পেরেক লাগানো অবস্থায় বর্তমানে তিনি তীব্র যন্ত্রণায় বারান্দায় ছটফট করছেন।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার দুখু মিয়া গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে মাথা ও পায়ে গুরুতর আঘাত নিয়ে বারান্দায় পড়ে আছেন। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, প্রায় ২০ ঘণ্টা পার হলেও তার ক্ষতস্থানে সেলাই দেওয়া হয়নি। তার মা মমতাজ বেগম জানান, পারিবারিক বিরোধে হামলার শিকার হয়ে দুখু মিয়ার মাথায় সেলাই দেওয়া হলেও পায়ের ক্ষত এখনো রক্তাক্ত অবস্থায় রয়েছে।
শুধু অর্থোসার্জারি বিভাগ নয়, হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড (২৪ ও ২৬ নম্বর) ঘুরেও একই চিত্র দেখা গেছে। বারান্দায় গাদাগাদি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে অসংখ্য শিশুকে। অনেক স্বজন অভিযোগ করেন, ঠিকমতো চিকিৎসা বা ওষুধ দেওয়া হচ্ছে না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার সামিরা আক্তার রানী তার তিন বছর বয়সী সন্তান ইউসুফ সাদকে নিয়ে গত শনিবার রামেকে আসেন। ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দায় চিকিৎসাধীন শিশুটির মা অভিযোগ করেন, তার সন্তানের জ্বর ১০৪ ডিগ্রির বেশি থাকলেও যথাযথ চিকিৎসা মিলছে না। ওষুধ ও ইনজেকশন বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
হাসপাতালের অন্য ওয়ার্ডেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া এক বৃদ্ধাকে মেঝেতে শুইয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসাসেবার এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সংগঠন ‘রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’র সাধারণ সম্পাদক জামাত খান।
তিনি বলেন, ‘সুচিকিৎসা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হলেও রামেক হাসপাতালে তা নিশ্চিত হচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে পরিস্থিতির উন্নতির দাবি জানানো হলেও বাস্তব অগ্রগতি নেই।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে রোগীদের ধীরগতিতে চিকিৎসা দিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়ার প্রবণতাও রয়েছে।’
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, ‘হাসপাতালটি ১২০০ শয্যার হলেও জনবল ও অবকাঠামো রয়েছে মাত্র ৫০০ শয্যার। অথচ প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার রোগী ভর্তি থাকছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে গিয়ে সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জনবল ও অবকাঠামো বৃদ্ধি, আশপাশের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা উন্নয়ন এবং বেসরকারি পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা বাড়ানো গেলে রামেক হাসপাতালের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।’