কুমিল্লায় নববর্ষ উপলক্ষে পহেলা বৈশাখে দুই দিনব্যাপী বিশাল মাছের মেলা বসেছে নগরের রাজগঞ্জ বাজারে। ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সরগরম উপস্থিতিতে বিশাল এ মাছের মেলা রাজগঞ্জ বাজার ছাড়িয়ে দুই পাশে প্রায় এক কিলোমিটার সড়কজুড়ে দীর্ঘ সারিতে পরিণত হয়েছে।
পহেলা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) এবং তার পরদিন (১৫ এপ্রিল) রাজগঞ্জ বাজার ঘুরে দেখা যায়, চারদিকে শুধু মাছ আর মাছ। মূল বাজার ছাড়িয়ে সড়কের দুই ধারে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসেছে মাছের মেলা। একদিকে রাজগঞ্জ ট্রাফিক মোড়, অন্যদিকে নগরের মোগলটুলি এলাকার কুমিল্লা হাইস্কুলের ফটক পর্যন্ত। মেলাজুড়ে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়, হাঁকডাক। তবে বড় আকারের মাছেই ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি।
কুমিল্লা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এখানে মাছ নিয়ে এসেছেন শৌখিন বিক্রেতারা। চাঁদপুর, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মাছ এসেছে।
রুই, কাতলা, বোয়াল, চিতল, মহাশোল, আইড়, গজার, কার্পসহ নানা প্রজাতির বড় বড় মাছের দেখা মিলছে এ মেলায়। এছাড়া দেশীয় প্রজাতির কই, টেংরা, পুঁটি, মলা, শিং, বাইমসহ ছোট মাছেরও পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা।
দুই দিনব্যাপী এ মেলা কুমিল্লাবাসীর নববর্ষের আনন্দকে দ্বিগুণ করে দিয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতারা এসে এ মেলা থেকে মাছ কিনে নিয়ে যান।
ক্রেতারা বলেন, প্রতিবছরই এই দিনটির জন্য অপেক্ষায় থাকেন তারা। নতুন বছরের প্রথম দিনে মেলা থেকে মাছ কিনে নিয়ে যাওয়ার আনন্দই আলাদা। দরদামের হেরফের নয়, বরং মেলা থেকে পছন্দের মাছ কিনতে পারার আনন্দটাকেই বড় করে দেখছেন তারা।
অপরদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, মেলার ক্রেতাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে প্রতিবছরই নির্দিষ্ট এই দুটি দিনের জন্য আলাদা প্রস্তুতি থাকে তাদের। সে প্রস্তুতির কারণে এবারও পুরো মেলাজুড়ে বড় বড় মাছের দেখা মিলছে। পহেলা বৈশাখ শুরু হওয়ায় মেলা চলে বছরের দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত।
কুমিল্লার দেবিদ্বার থেকে আসা বিক্রেতা আবদুল কাইয়ুম বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার মাছ কম এসেছে। তবে ক্রেতাদের উপস্থিতি আগের মতোই মনে হচ্ছে। তার দাবি, ক্রেতা বেশি থাকলেও মাছের দাম বাড়েনি।
মেলা ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন স্থান থেকে ট্রাক-পিকআপে করে বড় বড় মাছগুলো নিয়ে আসা হয়েছে। একটু একটু পরপর সেখান থেকে মাছ নামিয়ে এনে ডালায় সাজিয়ে রাখছেন ব্যবসায়ীরা। কোথাও পানির মধ্যে জীবিত মাছ রেখে বিক্রি হচ্ছে, আবার কোথাও ডালার মধ্যে মাছ লাফালাফি করছে।
মেলায় ১০ কেজির বেশি ওজনের মাছগুলো ১ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সর্বনিম্ন আড়াই থেকে ৩ কেজি ওজনের রুই/কাতলা বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে। আকারভেদে ক্রেতারা দরদাম নির্ধারণ করছেন।
ব্রাহ্মণপাড়ার সাহেবাবাদ এলাকা থেকে মাছ বিক্রি করতে আসা ব্যবসায়ী আবুল হোসেন বলেন, এ বছর গতবারের মতো বেশি বড় মাছ আনতে পারিনি। আমার কাছে সবচেয়ে বড় যে কাতলা মাছটি ছিল, তার ওজন ১৪ কেজি ৩০০ গ্রাম। এটি ১৪ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করেছি। ১০ কেজির বেশি ওজনের মাছ ১ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।
কুমিল্লা নগরীর রাজগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা হোসনেয়া বেগম বলেন, প্রতি বছরই আমরা রাজগঞ্জ বাজারের এই মাছের মেলার জন্য অপেক্ষা করি। বছরের প্রথম দিন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে এখান থেকে মাছ কেনার আনন্দটা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। কোরবানির ঈদের গরু কেনার যেমন আনন্দ, বছর শুরুর দিনে এখান থেকে মাছ কেনারও সেরকম আনন্দ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই মাছের মেলা কুমিল্লার ঐতিহ্যের অংশ। ঐতিহ্যবাহী এই মেলা ঠিক কবে শুরু হয়েছিল, নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। ধারণা করা হয়, মেলার বয়স শত বছরের বেশি। একসময় শুধু কাতলা মাছ উঠত, এখন অন্যান্য মাছও আসে।
শান্ত/রিফাত/