দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে দুর্যোগপ্রবণ এলাকা বলা হয়। বিভিন্ন সময়ের একাধিক দুর্যোগে এ অঞ্চলের মানুষই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের সময় মোবাইলফোন ও ইন্টারনেট কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতেও রেডিও ফ্রিকুয়েন্সি সক্রিয় থাকে। এই সময় মানুষ দুর্যোগের খবর জানতে রেডিও বরিশালের ওপর ভরসা রাখেন। কেন্দ্রটি থেকে প্রতিদিন ১৪ ঘণ্টারও বেশি সময় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়। কিন্তু দুর্বল ফ্রিকুয়েন্সির (তরঙ্গ) কারণে এসব অনুষ্ঠান বরিশাল নগরীর বাসিন্দাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নগরীর ১০-১৫ কিলোমিটারের আশপাশের মানুষ এসব অনুষ্ঠান শুনতে পান। অথচ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা থাকা মানুষের একটি বড় অংশই উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করেন, যাদের দূরত্ব নগরী থেকে অনেক দূরে। যাদের কথা চিন্তা করে রেডিওটি পরিচালনা করা হয়, তারাই এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরোনো ট্রান্সমিটার ও অবকাঠামোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কেন্দ্রটির উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না।
জানা যায়, দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালে বরিশালে একটি বেতার কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দীর্ঘসূত্রতার পর ১৯৯৬ সালের ৩০ জুন কেন্দ্রটি সম্প্রচার শুরু করে। পরে ১৯৯৯ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। তবে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিকায়ন না হওয়া ও যন্ত্রপাতির সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কেন্দ্রটি প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
কেন্দ্রটির কর্মকর্তারা জানান, এখানে ২০ কিলোওয়াট ক্ষমতার মিডিয়াম ওয়েভ ও ১০ কিলোওয়াটের এফএম ট্রান্সমিটার রয়েছে। প্রতিদিন এখান থেকে ১৪ ঘণ্টা ১৫ মিনিট অনুষ্ঠান সম্প্রচার হয়। অথচ এসব কর্মকাণ্ড সবার কাছে পৌঁছায় না। এফএম তরঙ্গ বরিশাল নগরীর আশপাশেই সীমাবদ্ধ থাকছে, আর মিডিয়াম ওয়েভ সিগন্যাল ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটারের বাইরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
জানা গেছে, সম্প্রতি কয়েক দিন বন্ধ থাকার পর এফএম ট্রান্সমিটার চালু করা হলেও এর কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে প্রত্যন্ত চরাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকার মানুষ কার্যত এই সেবা থেকে বিচ্ছিন্ন।
সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি শাহ সাজেদা বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য এটি শুধু একটি বেতার কেন্দ্র নয়, দুর্যোগের সময় জীবনরক্ষার মাধ্যমও। তাই এটিকে সচল রাখতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও গবেষক আনিচুর রহমান স্বপন বলেন, ‘দুর্যোগকালে মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেট অকার্যকর হয়ে পড়লেও বেতার কার্যকর থাকে। তাই এ মাধ্যমকে শক্তিশালী করা জরুরি। দ্রুত আধুনিকায়ন না হলে দুর্যোগপ্রবণ দক্ষিণাঞ্চলে জরুরি তথ্যপ্রবাহে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হতে পারে।’
তিনি মনে করেন, দীর্ঘদিনের অবহেলা ও পরিকল্পনার অভাবই এই অবস্থার জন্য দায়ী। একটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত হালনাগাদ না থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবেই। শুধু নতুন ট্রান্সমিটার স্থাপন নয়, প্রয়োজন সমন্বিত আধুনিকায়ন পরিকল্পনা, জনবল প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত মনিটরিং।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক হাফিজ আশরাফুল হক বলেন, ‘আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে শক্তিশালী সম্প্রচার ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর উপকূলের বাসিন্দা এবং সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের কাছে বাংলাদেশ বেতার এখনো একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। ঘূর্ণিঝড়প্রবণ দক্ষিণাঞ্চলে প্রতিটি মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেতারের সিগন্যাল দুর্বল হলে সেই বার্তা প্রত্যন্ত চরাঞ্চল বা উপকূলে পৌঁছাবে না, যা বড় ধরনের মানবিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’
সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন কেন্দ্রটি পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় সুধীজন কেন্দ্রটি আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের দাবি জানান। বর্তমান সক্ষমতা দিয়ে এই অঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠীকে কাভার করা সম্ভব নয় বলে তারা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রান্সমিটার স্থাপনের দাবি জানান।
এ সময় উপকূলীয় এলাকার মানুষকে দুর্যোগকালীন সতর্কবার্তা দ্রুত পৌঁছানোর জন্য বেতার বরিশাল কেন্দ্রের ফ্রিকুয়েন্সি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন মন্ত্রী। পাশাপাশি এটির অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে মন্ত্রীর পরিদর্শনের পরপরই বরিশাল বেতার কেন্দ্রটির পরিচালক ও আঞ্চলিক প্রকৌশলীকে ঢাকায় বদলি করা হয়েছে।
কেন্দ্রটির সদ্য বিদায়ী আঞ্চলিক প্রকৌশলী শামীম হোসেন জানান, নতুন ১০ কিলোওয়াট এফএম ট্রান্সমিটার স্থাপনের জন্য শিগগিরই দরপত্র আহ্বান করা হবে। তবে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই গণমাধ্যমটি আরও অকার্যকর হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।