‘একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাবো…’ গানটি বাজলেই ভেসে ওঠে ‘ছুটির ঘণ্টা’ সিনেমার সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্য; যেখানে স্কুলের শৌচাগারে আটকে পড়ে এক ছোট্ট শিশুর করুণ পরিণতি সবার চোখে পানি এনেছিল। মেহেরপুরেও ঠিক তেমনই এক আতঙ্কজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত বাস্তবতা সেই সিনেমার মতো নিষ্ঠুর হয়নি, কান্না থেমেছে নাটকীয় উদ্ধারের মধ্য দিয়ে।
গত বুধবার মেহেরপুর শহরের বিএম মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এমনই এক শিউরে ওঠা ঘটনা ঘটেছে। স্কুল ছুটির পর বাথরুমে আটকা পড়ে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী সাদিয়া (৮)। ভয়, অন্ধকার আর নিঃসঙ্গতার মধ্যে প্রায় ১ ঘণ্টা কাঁদতে থাকে সে। তার আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ে আশপাশ। দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের অবহেলায় তালাবদ্ধ স্কুল ভবনের ভেতরে একা পড়ে ছিল শিশুটি।
বুধবার বিকেল ৪টার দিকে স্কুল ছুটি হয়। শিক্ষার্থীরা একে একে বাড়ি চলে যায়। কিন্তু অজান্তেই বাথরুমে আটকে যায় সাদিয়া। এরপর শিক্ষকরা পুরো স্কুল ভবন ও মূল ফটকে তালা লাগিয়ে চলে যান। ফাঁকা ভবনের ভেতরে বন্দি হয়ে পড়ে সে। সময় যত গড়ায়, ভয় তত বাড়তে থাকে। শিশুটির কান্না ও চিৎকার স্কুলের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে সেই আর্তনাদ কানে আসে পথচারীদের। সন্দেহ হলে স্থানীয়রা ছুটে আসেন।
এদিকে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও মেয়ে বাড়ি না ফেরায় দুশ্চিন্তায় পড়ে যান তার বাবা মনিরুল ইসলাম। তিনি খোঁজ নিতে এসে স্থানীয়দের সঙ্গে যোগ দেন। পরে এলাকাবাসী মিলে স্কুলের মূল ফটক খুলে ফেলেন।
ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, ভবনের কলাপসিবল দরজা বন্ধ। সেটি খুলে বা ভেঙে শিশুটির কাছে যাওয়া যাচ্ছিল না। সময় গড়াতে থাকে, আর শিশুটির কান্না আরও করুণ হয়ে ওঠে। চরম উৎকণ্ঠার মুহূর্তে স্থানীয়রা এক শিক্ষিকাকে খবর দেন।
প্রায় ১ ঘণ্টা পর ঘটনাস্থলে পৌঁছান শিক্ষিকা লিনা ভট্টাচার্য। তার উপস্থিতিতে দরজা খোলা হয়। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় আতঙ্কে কাঁপতে থাকা সাদিয়াকে।
রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিষয়টি জানাজানি হলে গণমাধ্যমকর্মীরা স্কুলের অফিশিয়াল নাম্বারে যোগাযোগ করেন। তবে ফোন করলে তা কেটে দেওয়া হয়। পরে একাধিকবার কল করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি। এতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় রাত প্রায় ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে যান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম।। তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন এবং প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করেন। পরে তিনি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।
তিনি বলেন, ‘শিশুটি সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে, এটাই স্বস্তির বিষয়। তবে ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুতর। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে এবং শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।’