অবকাঠামো উন্নয়ন, নান্দনিকতা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং নগর পরিকল্পনার আধুনিক বাস্তবায়নে রাজশাহী আজ দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় নগরী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই নগরীর উন্মুক্ত পার্ক, নদীতীর ও বিনোদনকেন্দ্রগুলো দিন দিন দখল হয়ে যাচ্ছে। যেখানে সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে অবৈধ মোটরসাইকেল গ্যারেজ। প্রশাসনের দুর্বল নজরদারি এবং কার্যকর উদ্যোগের অভাবে এসব গ্যারেজ এখন স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। এতে একদিকে যেমন নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, অনদিকে হুমকির মুখে পড়ছে পরিবেশ ও নগর পরিকল্পনা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পদ্মা নদীর তীরবর্তী জনপ্রিয় বিনোদন এলাকা লালন শাহ মুক্তমঞ্চ, টি-বাঁধ এবং আই-বাঁধসহ নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গড়ে উঠেছে একাধিক অবৈধ মোটরসাইকেল গ্যারেজ। প্রতিদিন শত শত মোটরসাইকেল এসব স্থানে রাখা হচ্ছে। প্রতিটি থেকে নির্ধারিত ফি আদায় করা হচ্ছে। সরকারি কোনো অনুমোদন ছাড়াই এসব গ্যারেজের কার্যক্রম প্রকাশ্যে চলমান রয়েছে।
শুধু নদীতীর নয়, নগরীর মালোপাড়ায় থাকা ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত শহিদ মিনার ও সাংস্কৃতিক আয়োজন মঞ্চটি ঐতিহাসিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটিও এখন দখলদারদের কবলে পড়েছে। পার্কের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সারিবদ্ধভাবে মোটরসাইকেল রাখা হচ্ছে। এতে একদিকে পার্কের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে এর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বও ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নগরীতে বৈধভাবে অনুমোদিত মোটরসাইকেল গ্যারেজ রয়েছে মাত্র তিনটি। অথচ বাস্তবে অর্ধডজনের বেশি স্থানে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা গ্যারেজ তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন অনিয়ম চললেও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় দখলদাররা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় এসব গ্যারেজ পরিচালিত হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা একাধিক রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা-কর্মীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তারা কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই প্রকাশ্যে পার্কিং ফি আদায় করছেন। ফলে প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না।
তবে গ্যারেজ পরিচালকদের দাবি ভিন্ন। নগরীর লালন শাহ মুক্তমঞ্চ গ্যারেজ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মোটরসাইকেল চুরি প্রতিরোধ এবং এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তারা এ উদ্যোগ নিয়েছেন।
টি-বাঁধ এলাকায় গ্যারেজ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা আরেক ব্যক্তিও একই সুরে কথা বলেছেন। তিনি জানান, আদায় হওয়া অর্থ স্থানীয় উন্নয়ন ও সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হয়। যদিও এসব দাবির পক্ষে কোনো লিখিত বা আনুষ্ঠানিক প্রমাণ তিনি দেখাতে পারেননি।
এদিকে, এসব অবৈধ গ্যারেজের কারণে নগরবাসী পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। ফুটপাত ও উন্মুক্ত স্থান দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীদের চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে সড়ক দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে যানজট ও বিশৃঙ্খলা।
রফিকুল ইসলাম নামে নগরীর সাহেববাজার এলাকার এক পথচারী বলেন, ‘ফুটপাত দিয়ে হাঁটার কোনো সুযোগই নেই। বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামতে হয়। এতে সবসময় ভয় থাকে কখন যে দুর্ঘটনা ঘটে।’
আরেক পথচারী শিউলি বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পার্কে হাঁটতে গিয়ে দেখি সব জায়গা মোটরসাইকেলে ভর্তি। এটা তো মানুষের জন্য বানানো, গ্যারেজ বানানোর জন্য নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘এসব নিয়ে আলোচনা হলে মাঝে মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কিছুদিন পরই দখলদাররা আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে।’
রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমরা বন্ধুদের সঙ্গে নদীর পাড়ে সময় কাটাতে যাই। কিন্তু এখন সেখানে বসার জায়গাই পাই না। মোটরসাইকেলের ভিড়ে পুরো পরিবেশটাই নষ্ট হয়ে গেছে। প্রশাসনের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি আহমেদ শফি উদ্দিন বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জনসাধারণের জায়গা দখল করা হচ্ছে, যা আইনের শাসনের পরিপন্থি। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।’
তিনি বলেন, ‘এ সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। নিয়মিত ও কঠোর উচ্ছেদ অভিযান, বিকল্প বৈধ পার্কিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনের কড়াকড়ি নজরদারির মাধ্যমে জনসাধারণের স্থান দখলমুক্ত করতে হবে। না হলে রাজশাহীর পরিকল্পিত নগরায়ণ ও পরিবেশ দুটিই মারাত্মক সংকটে পড়বে।’
এ বিষয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, ‘অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে শিগগিরই অভিযান চালানো হবে। কোনো অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। আমরা দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেব।’