চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক সিআরবি (সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং) এলাকায় বেসরকারি হাসপাতাল প্রকল্প পুনরায় চালুর গুঞ্জনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রামের ফুসফুস হিসেবে পরিচিত এই সবুজ এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণের স্থান পরিদর্শনে রেলমন্ত্রীর সফরের কথা জানাজানি হওয়ায় ফের রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছেন পরিবেশবাদী ও নাগরিক অধিকার কর্মীরা।
সিআরবি রক্ষা মঞ্চ ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে গতকাল ররিবার বিকেলে সিআরবি এলাকায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনকারীরা জানিছেন, চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ ধ্বংস করে কোনোভাবেই সেখানে বাণিজ্যিক হাসপাতাল নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না।
এদিকে সড়ক পরিবহন ও রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম দুই দিনের সফরে (শনি-রবি) চট্টগ্রামে অবস্থান করছেন। সফরসূচি অনুযায়ী, রবিবার বিকেল ৪টায় তার সিআরবিতে প্রস্তাবিত হাসপাতালের স্থানটি পরিদর্শনের কথা রয়েছে। একই স্থানে মানববন্ধনের কর্মসূচি দিয়েছে নাগরিক সমাজ।
স্থানীয়রা জানায়, দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন বছর পর প্রকল্পটি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তৎপরতাকে অশনি সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। মন্ত্রীর সফরের ঠিক আগে গত বৃহস্পতিবার সিআরবি সাত রাস্তার মোড়সংলগ্ন ২০টি দোকান উচ্ছেদ করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। যদিও রেলওয়ে একে নিয়মিত অভিযান বলছে। কিন্তু আন্দোলনকারীদের দাবি- হাসপাতাল প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ পরিষ্কার করতেই এই তড়িঘড়ি উচ্ছেদ।
এর আগে, ২০২১ সালে প্রথম এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে টানা ১৫ মাস অবস্থান ধর্মঘট ও বিক্ষোভ চলেছিল। সে সময় ছাত্র-জনতা, পরিবেশবাদী ও নাগরিক সমাজের আন্দোলনের মুখে সরকার সিআরবিতে হাসপাতাল না করার আশ্বাস দেয়। পরে ২০২২ সালের নভেম্বরে সেই আন্দোলন স্থগিত করা হয়।
সিআরবি রক্ষা মঞ্চের আহ্বায়ক ও মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘সিআরবি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানে হাসপাতাল হলে ধীরে ধীরে পুরো এলাকাটি কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হবে।’
পরিবেশবিদ আলিউর রহমান বলেন, ‘প্রাকৃতিক অক্সিজেন ব্যাংক খ্যাত এই এলাকায় হাত দেওয়া হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। আমরা কোনোভাবেই তা হতে দেব না।’
জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান জানান, ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে রেলওয়ের ৫০ বছরের একটি চুক্তি রয়েছে। তবে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উপর মহল থেকে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা আসেনি। অন্যদিকে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের এখনো চুক্তি বাতিলের কথা বলেনি।
জানা গেছে, প্রায় ৬ একর জমিতে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ও ১০০ আসনের মেডিকেল কলেজ নির্মাণের জন্য ২০১৩ সালে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এই পরিকল্পনা শুরু থেকেই বিতর্কিত।
ঔষধিগাছে ভরপুর প্রাকৃতিক হাসপাতাল খ্যাত সিআরবিতে হাসপাতাল প্রকল্প বন্ধের দাবিতে বিবৃতি দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা।
সিআরবি এলাকাটি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) ‘কালচারাল হেরিটেজ’ হিসেবে চিহ্নিত। ড্যাপের নির্দেশনা অনুযায়ী, এখানে বাণিজ্যিক স্থাপনা বা বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমতি নেই।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওমর ফারুক রাসেলের নেতৃত্বে বেসরকারি সংস্থা ইফেক্টিভ ক্রিয়েশন অন হিউম্যান ওপিনিয়ন (ইকো) গবেষণায় দেখা গেছে, সিআরবি এলাকায় ২২৩ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে, যার মধ্যে ১৮৩টি ঔষধিগাছ। এ ছাড়া বিপন্ন ও বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির গাছও রয়েছে। শতবর্ষী বড় বড় গাছসহ এই এলাকা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিভিন্ন রোগের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত এসব উদ্ভিদের কারণে এলাকাটিকে অনেকেই ‘প্রাকৃতিক হাসপাতাল’ হিসেবে উল্লেখ করেন।