দাম বৃদ্ধির ঘোষণার পরও রাজশাহীতে জ্বালানি তেলের সংকট কাটেনি। বরং সরবরাহ ঘাটতির কারণে আগের মতোই দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে বাস, ট্রাক ও মোটরসাইকেল চালকরা ফিরে যাচ্ছেন। এতে পরিবহন খাত থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে বহুমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
গতকাল রবিবার নগরীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পাম্পে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ। কোথাও টাঙানো হয়েছে ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড। আবার কোথাও বিকেলে তেল আসতে পারে এমন আশায় সকাল থেকেই অনেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলায় মোট ৪৪টি পেট্রল পাম্পের মধ্যে মাত্র ১৪ থেকে ১৫টিতে সীমিত আকারে তেল সরবরাহ করা হয়েছে। এসব পাম্পে অপেক্ষারত মানুষের ভিড় দেখা যায়।
জ্বালানিসংকট ও মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। তেল না পাওয়ায় অনেক বাস ও ট্রাক নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী চলাচল করতে পারছে না। এতে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে, যাত্রী পরিবহনেও অনিয়ম দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে রাজশাহী থেকে দূরপাল্লার বিভিন্ন রুটে বাস ভাড়া বেড়েছে। আন্তনগর ও লোকাল পরিবহনেও ভাড়া সমন্বয়ের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, ফলে সাধারণ যাত্রীদের অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বিভিন্ন সেবা খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। নগরীতে অটোরিকশা, ভ্যান ও রিকশা ভাড়া বেড়েছে। ডেলিভারি সার্ভিস, নির্মাণ কাজ এবং কৃষি সেচ কার্যক্রমেও খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে ছোট ব্যবসায়ী ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
পরিবহন ব্যয় বাড়ার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। পাইকারি পর্যায়ে বাড়তি খরচ যুক্ত হওয়ায় খুচরা বাজারেও দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে চাল, সবজি, মাছ-মাংসসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।
তেলসংকট ও মূল্যবৃদ্ধির দ্বৈত চাপে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। একদিকে যাতায়াত ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পাওয়ায় চালকরা সময় ও শ্রম– দুই দিকেই ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
পবা উপজেলার বেসরকারি চাকরিজীবী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিদিন মোটরসাইকেলে যাতায়াতের জন্য আমার অন্তত দুই লিটার তেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু ঈদের আগে থেকে বিভিন্ন পাম্পে ঘুরেও তেল মিলছিল না। কোথাও দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। দাম বৃদ্ধির ফলে এই সংকট নিরসন হবে ভেবেছিলাম। কিন্তু এখনও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। এতে আমরা অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হলাম, আবার দুর্ভোগও কমলো না।’
হাবিব ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি নিতে আসা বাগধানীর কৃষক আতাউর রহমান জানান, জমিতে সেচ দেওয়া যাচ্ছে না। পটোলের আবাদ, মরিচের আবাদ, বোরো ধান খেত খরতাপে শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। এক সপ্তাহ ধরে পটোলের গাছ মরে যাচ্ছে শুধু সেচের অভাবে। তিনি আরও জানান, প্রতিদিন তেলের খোঁজে ঘুরে কৃষকদের সময়, শ্রম ও টাকা সবই নষ্ট হচ্ছে। নিজ এলাকায় তেল না পেয়ে তিনি সেচযন্ত্র মাথায় করে পাম্পে এসেছেন।
মোহনপুরের বিদিরপুরের কৃষক কামাল হোসেন জানান, তার এলাকায় তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এই একটা পাম্পে জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে শুনে সেচযন্ত্র নিয়ে চলে এসেছেন। কিন্তু তেল কিনতে আসা যাওয়াতে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা খরচ হচ্ছে।
পবার বড়গাছি ইউনিয়নের কৃষক বাবলু হোসেন বলেন, ১৩ কিলোমিটার দূর থেকে এসেছি তেল নিতে। এসে দেখি একেকজনকে মাত্র ৩০০ টাকার তেল দিচ্ছে। এই তেল দিয়ে আমাদের সেচযন্ত্র কতক্ষণ চলবে।
তিনি জানান, পাঁচ কাঠা জমিতে সেচ দিতে গেলেই ৩০০ টাকার তেল শেষ হয়ে যায়। এতে পান, পাটসহ বিভিন্ন ফসলের সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ফিলিং স্টেশন মালিকরা বলছেন, সীমিত বরাদ্দের কারণে তারা চাহিদা অনুযায়ী তেল দিতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে রেশনিং পদ্ধতি অনুসরণ করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
রাজশাহী জেলা পেট্রল পাম্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান শিমুল বলেন, ঈদের আগে মজুদ করা তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছিল। পরে কিছু তেল সরবরাহ শুরু হলেও তা খুবই অপ্রতুল ছিল। একেকটি ট্যাংকারের ধারণক্ষমতা প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার লিটার হলেও অনেক ক্ষেত্রে তিন হাজার লিটার পর্যন্ত সরবরাহ পাওয়া গেছে। ফলে ভোগান্তি এখনও কিছুটা থেকে গেছে। তবে শিগগিরই এই সমস্যার সমাধান হবে বলে ধারণা করছি।