সাতক্ষীরা জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে বিচারপ্রার্থীদের বিশ্রামের জন্য নির্মিত ন্যায়কুঞ্জ এখন বাণিজ্যিক খাবারের হোটেলে পরিণত হয়েছে। প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই আধুনিক বিশ্রামাগারটি এখন সেবাপ্রার্থীদের বিশ্রামাগারের বদলে নাশতা আর চায়ের দোকানে পরিণত হয়েছে। এতে বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
জানা গেছে, গত বছরের ৫ এপ্রিল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মাহমুদুল হক প্রায় ৮০০ বর্গফুট আয়তনের এই ন্যায়কুঞ্জটি উদ্বোধন করেন। উদ্দেশ্য ছিল দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিচারপ্রার্থীদের জন্য ৪০ জনের বসার ব্যবস্থা, নারী-পুরুষের পৃথক ওয়াশরুম, ব্রেস্টফিডিং জোন এবং বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা। তবে উদ্বোধনের কয়েক মাস পরেই এর সেবা কার্যক্রম বন্ধ করে এটিকে ভাড়ায় দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা জজ আদালতের নাজির আব্দুল কাদের গাজী ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই বিশ্রামাগারটি সাবেক প্রসেস সার্ভার এবং পেশকার আব্দুল মুকিতের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। বর্তমানে আব্দুল মুকিত হজে থাকায় তার ভাগনে শেখ আলমগীর হোসেন সেখানে পুরোদমে হোটেল ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিশ্রামাগারের ভেতর এখন পরোটা, ভাজি, শিঙাড়া, সমুচা ও চা বিক্রি হচ্ছে। বসার আসনগুলো খাবার রাখার জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা সেখানে বসার সুযোগ পাচ্ছেন না। অভিযোগ রয়েছে, খাবার অর্ডার না করলে বিচারপ্রার্থীদের সেখান থেকে চলে যেতে বলা হয়।
আদালতে আসা বিচারপ্রার্থীরা অভিযোগ করেন, বিচারের আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হলেও বিশ্রামের কোনো জায়গা নেই। সরকারি টাকা খরচ করে তাদের জন্য ভবন নির্মাণ করা হলেও সেখানে এখন দোকান বসিয়ে ব্যবসা করা হচ্ছে।
জেলার কালিগঞ্জ উপজেলা থেকে আসা বিচারপ্রার্থী সেলিম হোসেন বলেন, ‘মামলার হাজিরা দিতে আমি সকাল থেকে আদালত চত্বরে দাঁড়িয়ে আছি। শরীর খারাপ লাগায় একটু বসার জন্য ন্যায়কুঞ্জের ভেতরে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে বসার সঙ্গে সঙ্গে হোটেলের লোক এসে জিজ্ঞেস করে কী খাব? আমি বললাম কিছু খাব না, শুধু বসব। তখন তারা জানান, কিছু না খেলে এখানে বসা যাবে না। এটা কাস্টমারদের বসার জায়গা।’
তালা উপজেলার থেকে আসা বৃদ্ধ আজিজুল হক বলেন, ‘বয়সের কারণে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। ভেবেছিলাম এখানে (ন্যায়কুঞ্জ) একটু আরাম করতে পারব। কিন্তু গিয়ে দেখি ভেতরে চুলা জ্বলছে। খাবারের গন্ধে থাকা যাচ্ছে না। চেয়ারগুলো নাশতার প্লেটে দখল হয়ে আছে। সরকারি জায়গায় এমনভাবে ব্যবসা বসানো হয়েছে যে, আমাদের মতো সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের ঢোকার উপায় নেই।’
অন্যদিকে, আইনজীবীরা মনে করছেন, ন্যায়কুঞ্জ এভাবে বাণিজ্যিকীকরণের কারণে আদালতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তারা এই অবৈধ হোটেল দ্রুত অপসারণ করে ন্যায়কুঞ্জকে তার প্রকৃত উদ্দেশ্যের জায়গায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।
ন্যায়কুঞ্জ ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে অভিযুক্ত নাজির আব্দুল কাদের গাজীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। এছাড়া সেখানে ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা আলমগীর হোসেনও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
মানবাধিকারকর্মী মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, ‘বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ লাঘবে সরকার লাখ লাখ টাকা খরচ করে এই ন্যায়কুঞ্জ নির্মাণ করেছে। এটি সম্পূর্ণ মানবিক এবং আইনি অধিকারের অংশ। কিন্তু আদালত চত্বরের এই বিশ্রামাগারকে যেভাবে বাণিজ্যিক হোটেলে রূপান্তর করা হয়েছে, তা চরম অমানবিক ও নিন্দনীয়। সরকারের কিছু অসাধু কর্মচারী কিংবা কর্মকর্তারা মিলে সরকারি সম্পদকে লিজ দিয়ে বাণিজ্যিক ব্যবসার সম্পদে পরিণত করেছেন, যা সরাসরি দুর্নীতির শামিল। অবিলম্বে এই অবৈধ হোটেল উচ্ছেদ করে ন্যায়কুঞ্জকে বিচারপ্রার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানাচ্ছি।’