মায়ানমারে অভ্যন্তরীণ সহিংসতার পর ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর মংডু শহরসহ বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তের রাখাইন রাজ্যের প্রায় ২৭১ কিলোমিটার এলাকা দখলে নেয় সে দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরাকান আর্মি। এরপর থেকে শুরু হয় বাংলাদেশি জেলেদের নাফনদী ও বঙ্গোপসাগর থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা। সীমান্ত এলাকায় প্রায়ই এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। যা এখন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আটক জেলেদের শারীরিকভাবে নির্যাতন চালানো হয় এবং ঠিকমতো খাবার দেওয়া হয় না বলে জানা গেছে।
আরাকান আর্মির কবল থেকে নিরাপত্তার আশায় নাফ নদীর মোহনা এলাকায় সীমানা বয়া স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন জেলেরা। জিরো লাইনে সীমানা বয়া না থাকায় গত এক বছরে আরাকান আর্মির হাতে ৩৮৫ জন জেলে আটক হয়েছেন। এর মধ্যে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডসহ অন্যান্য বাহিনীর সহযোগিতায় ২১০ জন জেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও এখনো অনেক জেলে আরাকান আর্মির হেফাজতে রয়েছেন।
বিজিবি সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রবিবার বিকেলে নাফনদীর শূন্য লাইনে আরাকান আর্মির কাছ থেকে ৭৩ জন জেলেকে গ্রহণ করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) টেকনাফ পৌরসভা ট্রানজিট জেটিঘাটে তোলে। পরবর্তী সময়ে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ফেরত আসা জেলেদের মধ্যে ৬৬ জন বাংলাদেশি এবং ৭ জন এফডিএমএন (রোহিঙ্গা) নাগরিক।
শাহপরীর দ্বীপ ডাংগরপাড়া এলাকার বাসিন্দার মো. কালুর ছেলে জাহাঙ্গীর আলম জানান, শাহপরীর দ্বীপ পশ্চিমপাড়া নৌঘাটে মাছ শিকারের সময় গত বছরের ২৫ আগস্ট সকাল ১০টায় সেন্টমার্টিনের পূর্ব পাশে সাগরে মাছ শিকারের সময় অস্ত্রের মুখে বহু জেলেকে জিম্মি করে ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। দীর্ঘ ৫ মাস ২৩ দিন পর বিজিবির প্রচেষ্টার মাধ্যমে ৭৩ জন জেলেকে ফেরত আনা হয়েছে। এদের মধ্যে জাহাঙ্গীর আলমও ছিলেন।
ডাংগরপাড়া এলাকার আরেক বাসিন্দা আবু সামার ছেলে নুর আলম বলেন, আমরা হলাম জেলে, আমাদের মাছ শিকার করে সংসার চালাতে হয়। সাগরে মাছ শিকারে গেলে মায়ানমারের জলসীমা অতিক্রম করার অপরাধে আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যায়। তারা আমাদের কোনো খাবার দিত না এবং হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে মাটিকাটাসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করাতো। বাংলাদেশ সরকার যদি জেলে পরিবারের কষ্টের কথা চিন্তা করে নাফনদী থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত সীমানা চিহ্নিত করার জন্য বয়া দেয়, তাহলে তা আমাদের জন্য উপকার হবে। তখন মায়ানমারের জলসীমায় আর আমরা প্রবেশ করব না।
শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, দ্বীপের বাসিন্দা হিসাবে সরকারের কাছে আমাদের দাবি- বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর কাছে নত না হয়ে নাফনদীতে ড্রেজিং করে বিকল্প চ্যানেল ও জিরো লাইন চিহ্নিত করে সীমানা শনাক্তকরণ বয়া বসানো। তাহলে জেলেদের আরাকান আর্মির কবল থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
টেকনাফ পৌরসভা কায়ুকখালী বোট মালিক সমিতির সভাপতি সাজেদ আহমদ বলেন, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে মায়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তবর্তী শহর মংডুর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের পর থেকে ঝামেলাটা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ-মায়ানমার জলসীমায় কোনো চিহ্ন না থাকার কারণে আরাকান আর্মি বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে যায়। জান্তা সরকার থাকাকালীন এভাবে কখনো জেলেদের আটক করা হয়নি। যোগাযোগ ধরে এই চ্যানেল দিয়ে যাতায়াত করে যাচ্ছে ট্রলারগুলো। মাঝেমধ্যে আটক করলেও বিজিবির মাধ্যমে ফেরত আনা হয়।
তিনি বলেন, জেলে পরিবারের কষ্টের কথা চিন্তা করে সরকার যদি যাতায়াতের জন্য বাংলাদেশ-মায়ানমার জলসীমা চিহ্নিত করে বয়া দেয়, তাহলে বোঝা যাবে আরাকান আর্মি জেলেদের বাংলাদেশের জলসীমানা থেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে নাকি মায়ানমারের জলসীমানা অতিক্রম করায় ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
টেকনাফ ব্যাটালিয়ন-২ বিজিবির সূত্রে জানা গেছে, আরাকান আর্মি মংডু শহর দখলে নেওয়ার পর থেকে মায়ানমারের জলসীমা অতিক্রমের কারণে প্রায় সময় জেলেদের আটক করে নিয়ে যায়। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত মাছ ধরার সময় আরাকান আর্মি মোট ৩৮৫ জন জেলেকে আটক করেছে। পরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডসহ অন্যান্য বাহিনীর সহযোগিতায় বিভিন্ন ধাপে মোট ২১০ জন জেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এখনো আরাকান আর্মির হেফাজতে রয়েছে আনুমানিক ১৭৫ জন জেলে।
গত ৩০ এপ্রিল দুপুরে টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের ৫ নম্বর স্লুইস গেটের দক্ষিণে নাফনদী ও এর মোহনা থেকে মাছ শিকারের সময় দুটি নৌকাসহ ৭ জেলেকে ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। আটক জেলেরা হলেন- সাবরাং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা লাল মিয়ার ছেলে আবদুর রহমান (৫০), নুর আহাম্মদের ছেলে সাব্বির আহমদ (৫৫), মৃত মকবুল আলীর ছেলে গুরা মিয়া (৭০) এবং নুরুল মিয়ানের ছেলে আব্দুল মতলব (৩৫), শাহপরীর দ্বীপ ডেইলপাড়া এলাকার বাসিন্দা আমতল আলী ও তার দুই ছেলে নুর আবছার ও আবদুর রহিম।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, নাফ নদী ও সংলগ্ন সমুদ্র এলাকায় বাংলাদেশি জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের অগ্রাধিকারমূলক দায়িত্ব। এ লক্ষ্যে কোস্ট গার্ড নিয়মিত টহল জোরদার করার পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করেছে, যাতে জেলেরা নিরাপদে মাছ আহরণ করতে পারেন।
তিনি আরও জানান, জেলেদের সচেতনতা বাড়াতে কাউন্সেলিং, লিফলেট বিতরণ, মাইকিং এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সেমিনারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সীমারেখা সম্পর্কে অবহিত করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, অনেক জেলে অসাবধানতাবশত কিংবা বেশি মাছ ধরার আশায় আন্তর্জাতিক সীমারেখা অতিক্রম করে ফেলেন। ফলে আরাকান আর্মির হাতে তাদের আটক হওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কোস্ট গার্ড অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আটক জেলেদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত টহল জোরদারের মাধ্যমে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কমাতে কোস্ট গার্ড নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
কক্সবাজার জেলার প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, বাংলাদেশ-মায়ানমার জলসীমানা যেহেতু আন্তর্জাতিক সীমানা, তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের সঙ্গে কথা বলে সীমানা বয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
কক্সবাজার রামু সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, মাছ শিকারের সময় মায়ানমারের জলসীমানা পার হলে বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে আরকান আর্মি। তবে বিজিবির সীমাবদ্ধতার কারণে সাগরের বিষয়ে কিছু করতে পারে না তারা।