রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার মামলার রায় আজ ঘোষণা হবে। এ ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনার মধ্যেই আবারও সামনে এসেছে মাগুরার শিশু আছিয়া হত্যা মামলা। মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ার এক বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনো কার্যকর হয়নি সেই সাজা। আর এ নিয়েই ক্ষোভ, হতাশা ও শঙ্কার কথা জানিয়েছেন আছিয়ার মা আয়েশা খাতুন।
২০২৫ সালের ৫ মার্চ মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার জারিয়া গ্রামে বড় বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয় তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আছিয়া। গুরুতর অবস্থায় প্রথমে তাকে মাগুরা ও পরে ঢাকায় নেওয়া হয়। কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল।
ঘটনার পর করা মামলায় দ্রুত বিচার কার্যক্রম শেষে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকরের আগে হাইকোর্টের অনুমোদন এবং আপিল শুনানি সম্পন্ন হওয়া বাধ্যতামূলক তাই মামলাটি এখনও উচ্চ আদালতের বিচারাধীন রয়েছে।
আছিয়ার পরিবারের আইনজীবী মনিরুল ইসলাম মুকুল বলেন, মামলাটির আপিল শুনানি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের থেকে দ্রুত শুনানি নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় উচ্চ আদালতেও বহাল থাকবে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সোহেল আহমেদ জানান, সর্বশেষ শুনানি হয়েছিল গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে। বর্তমানে মামলার কার্যক্রম ঢাকায় উচ্চ আদালতে চলমান রয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে এসব আইনি ব্যাখ্যার মধ্যেও সন্তুষ্ট নন আছিয়ার মা। তার ভাষায়, আছিয়ার ঘটনায় পুরো দেশ আন্দোলন করেছে, বিচার চেয়েছে। আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায়ও দিয়েছেন। কিন্তু সেই রায় এখনো কার্যকর হয়নি।
আয়েশা খাতুন বলেন, এক বছর দুই মাস ধরে আমি বিচার চেয়ে আসতেছি। আদালত রায় দিল, কিন্তু সেই বিচার তো আমি চোখে দেখলাম না। যদি তখনই বিচারটা কার্যকর হইত, তাহলে হয়ত রামিসার মতো আরও অনেক শিশু বাঁচত। অনেক মায়ের বুক খালি হইত না।
তিনি বলেন, শিশু নির্যাতনের অনেক ঘটনা সংবাদে আসে, আবার কিছু ঘটনা অজানাই থেকে যায়। কিন্তু অপরাধীরা যখন শাস্তি কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লাগে দেখে, তখন সমাজে ভুল বার্তা যায় বলেও মনে করেন তিনি।
রামিসার ঘটনার কথা উঠতেই আবেগাপ্লুত হয়ে আছিয়ার মা বলেন, আমার মেয়ের জন্য যতটুকু কাঁদছি, ওই মেয়েটার জন্যও ততটুকুই কাঁদছি। এতটুকু একটা বাচ্চার সঙ্গে মানুষ কেমন করে এমন করতে পারে? ছোট শিশুদের যদি সম্মান না দিতে পারে, তাহলে বড়দের সঙ্গে তারা কী করতে পারে?
বিচার না পাওয়ার হতাশার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। তার দাবি, মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। এ কারণে তিনি নিজে এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।
তিনি বলেন, একটা সন্তান হারাইছি, আরেকটা সন্তান আছে। ওদের নিয়েই ভয় লাগে। স্বামী অসুস্থ, সবসময় তো পাহারা দিতে পারি না। কখন কে কী করে, সেই ভয় সবসময় কাজ করে।
বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আয়েশা খাতুন বলেন, এতদিনেও বিচার কার্যকর না হওয়ায় আস্থা অনেকটাই শেষ হয়ে গেছে। মনে হয়, বিচার হলে এতদিনে হয়ে যেত।
রামিসার বাবা যেমন আল্লাহর বিচারের কথা বলেছেন, সেই প্রসঙ্গ টেনে আছিয়ার মাও বলেন, এখন মানুষ বলে, আল্লাহ ছাড়া বিচার করার কেউ নেই। কারণ এতদিন অপেক্ষা করেও আমরা বিচার দেখতে পেলাম না।
আজ যখন রামিসা হত্যা মামলার রায়ের দিকে দেশ তাকিয়ে আছে, তখন একইসঙ্গে আলোচনায় উঠে এসেছে আছিয়ার পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষার গল্পও। একটি মামলায় রায় ঘোষণার দিনেই আরেকটি মামলার রায় বাস্তবায়ন না হওয়ার প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে বিচারপ্রক্রিয়ার গতি, শাস্তি কার্যকর এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে জনমতের আলোচনা।
কাসেমুর রহমান/নাঈম