সিরাজগঞ্জের সদর উপজেলার মাসুমা এনায়েত পেশায় পরিবার কল্যাণ সহকারী। ভোরের আলো ফোটার আগেই কর্মব্যস্ততার কারণে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন তিনি। কখনো পায়ে হেঁটে আবার কখনো নৌকায় চড়ে পৌঁছে যান সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার নদীভাঙন কবলিত খোকশাবাড়ী চরে। নদীভাঙ্গন কবলিত খোকসাবাড়ি চরে মানুষের বাড়ি বাড়ি যান। দরজায় দরজায় কড়া নাড়েন, কখনও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে জম্ম নিয়ন্ত্রণের কাউন্সেলিং করেন। নারীদের তিনি বোঝান কিভাবে পরিবার ছোট রাখতে হবে, সুস্থ থাকতে হবে। কিন্তু দিন শেষে ফেরার পথে বুকটা ভারী হয়ে যায় তার। কারণ জম্ম নিয়ন্ত্রণের কাউন্সেলিং করতে পারলেও নারীদের হাতে তুলে দেওয়ার মতো একটি জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়িও দিতে পারেন না তিনি।
পরিবার কল্যাণ সহকারী মাসুমা এনায়েত বলেন, আমরা মাঠে যাই, কথা বলি, জম্ম নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে মানুষকে বোঝাই কিন্তু ওষুধ সামগ্রী দিতে পারি না।কারণ দুই বছর যাবত জম্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য খাবার বড়ি, কনডমসহ ওষুধসামগ্রী সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে নারীদের কিছুই দিতে পারি না। মানুষ বলে, শুধু কথায় কি পেট বাঁধা যায়? আমাদের কাছে কোনো জবাব নেই। ওষুধ সরবরাহ বন্ধ থাকায় কোন কাজেই আসছে না আমাদের প্রশিক্ষণ ও পরিশ্রম।
সিরাজগঞ্জ জেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে সারা দেশে জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি, কনডম, ভায়াল, আইইউডি, ও ডিডিএস কীটসহ সকল লজিস্টিক সামগ্রী আমদানি ও সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে এই সামগ্রী আমদানিতে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় দীর্ঘ দুই বছর ধরে চলছে এই সংকট। ফলে এ সংকটের প্রভাব পড়েছে জেলার কমিউনিটি হাসপাতালগুলোতেও। প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাবে অনেক হাসপাতাল পরিবার পরিকল্পনা সংক্রান্ত সেবা কার্যত বন্ধ রেখেছে।
পরিবার পরিকল্পনার সাথে সংশ্লিষ্টরা জানান, চরে যেখানে বেশিরভাগ মানুষই দারিদ্যসীমার নীচে। নুন আনতেই যেখানে পান্তা ফুরোয় সেখানে পয়সা খরচ করে জন্ম নিয়ন্ত্রণের উপকরণ কেনার কোনো আগ্রহই নেই মানুষগুলোর মাঝে। তাই পিছিয়ে পড়া হতদরিদ্র এই জনগোষ্ঠিতে ঘটছে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঘটনা। এছাড়া সাধারণত ঘরের নারীরাই তাদের থেকে জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী নিতেন। এখন সরবরাহ না থাকায় সুবিধাভোগীদের হাতে তুলে দেওয়া যাচ্ছে না কোনো উপকরণ। সামাজিকভাবে বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলাভাবে আলোচনা করতে লজ্জা পাওয়ায়, প্রয়োজন থাকলেও কিনে ব্যবহার করতে পারছেন না জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি বা কনডম।
আর সচেতন মহল বলছে, সঠিকভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ করা না গেলে, ঘটবে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ। তাই অতিদ্রুত জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী আমদানি এবং মাঠ পর্যায়ে বিতরণ শুরুর দাবি তাদের।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রেবেকা সুলতানা বলেন, আমরা কোনোভাবেই মা ও শিশুদের সেবা দিতে পারছি না। আমাদের কাছে জম্ম নিয়ন্ত্রণের ওষুধ সামগ্রী নেই সরবরাহ বন্ধ রয়েছে, ফলে দিতে পারছি না। আবার লজ্জায় কেউ দোকান থেকে কিনতে পারে না। পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
সিরাজগঞ্জ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপ-পরিচালক মাহমুদা খাতুন খবরের কাগজকে বলেন, এই হারে জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে আগামী কয়েক বছরে পরিসংখ্যান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটা ভাবলে শঙ্কা হয়। এখনই ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
সিরাজগঞ্জ পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রায়হানুল ইসলাম জানান, ২০২৪ সাল থেকে জম্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য খাবার বড়ি ও কনডমসহ সকল ওষুধ সামগ্রী সেবা বন্ধ রয়েছে। এই লজিস্টিক ছাড়া জম্ম নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে, পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী আমদানির বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।
সিরাজুল ইসলাম শিশির/এসএন