অনিয়ম-দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে চলছে কুড়িগ্রাম প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) কার্যক্রম। অতিরিক্ত ভাতা প্রদান ও ভুয়া বিল-ভাউচারসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ১১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির সুপারিনটেনডেনটের বিরুদ্ধে।
দীর্ঘদিন ধরে পরিষ্কার-পরিছন্নতা অভিযান পরিচালনা না করার কারণে পিটিআই এলাকা জঙ্গলে ভরে গেছে। ফলে পিটিআইয়ের পরীক্ষণ বিদ্যালয়, মহিলা ও পুরুষ হোস্টেলে মশা-মাছিসহ বিভিন্ন পোকামাকড়েরে উপদ্রব বেড়ে গেছে।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠান চত্বর বহিরাগতদের মাদক সেবনকারীদের অভরায়ণ্যে পরিণত হয়েছে। ফলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে অভিভাবক ও প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষকরা।
প্রশিক্ষণার্থী ও পিটিআই সূত্র জানায়, সুপারিনটেনডেন্ট জয়নুল আবেদীন ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর কুড়িগ্রাম পিটিআইতে যোগদান করেন। তার যোগদানের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছে। তার এমন কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের নামে জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে প্রায় ১১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পেয়েছে অডিট টিম।
সূত্র আরও জানায়, জয়নুল আবেদীন যোগদানের পর থেকে সরকারি নিয়মের তোয়াক্কা না করে প্রতিষ্ঠানের গেস্টরুমে অবস্থান করে আসছেন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে সরকারের নির্ধারিত ভাড়া বাবদ ৪ লাখ ৩২ হাজার টাকা, টিচিং লার্নিং মেটেরিয়ালস বাবদ ১০ হাজার টাকা, মনিহারি বাবদ ৬০ হাজার, সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে উপজেলা পর্যায়ে যাতায়াত করে রাত্রি যাপন দেখিয়ে ভুয়া ৫০ হাজার টাকার ভ্রমণ বিল, সরঞ্জামাদি ক্রয় বাবদ ২০ হাজার টাকা, তথ্য পুস্তক ক্রয় বাবদ ১ লাখ ১৩ হাজার ৪০০ টাকা, ম্যাগাজিন প্রকাশ বাবদ ২০ হাজার টাকা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নামে ৬৩ হাজার টাকা, শিক্ষকদের এক দিনের ডিএ ভাতা বাবদ ৪৬ হাজার ৬১৫ টাকা, ২৩৩ জনের এক দিনের আইসিটি প্রশিক্ষণ বাবদ ১ লাখ ৬৩ হাজার ১০০ টাকা ডিএ ভাতা, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে নতুন ব্যানার বাবদ ১ হাজার টাকা, তাদের দুপুরে খাবারসহ সকাল-বিকেলের নাশতা বাবদ ৪৬০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পিটিআই প্রাঙ্গণ জঙ্গলে পরণিত হয়েছে। মশা, পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে গেছে। ফলে পরীক্ষণ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদানসহ পুরুষ, মহিলা হোস্টেলে থাকা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। প্রধান গেট দিনরাতে উন্মুক্ত থাকায় বহিরাগত ও মাদক সেবনকারীরা নির্বিঘ্নে যাতায়াত করছেন।
জানা যায়, সুপারিনটেনডেন্ট জয়নুল আবেদীন প্রতি মাসে বাসা ভাড়া কাটার নিয়ম থাকলেও তিনি তা কর্তন না করে বেতন-ভাতার সঙ্গে বাসা ভাড়া উত্তোলন করেছেন।
প্রশিক্ষণার্থীরা পারিবারিক কারণে ছুটি নিতে গেলে সুপারিনটেনডেন্ট তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সংস্কারের জন্য প্রাক্কলন চাইলেও তিনি এলজিডিকে সমস্যার কথা জানাননি ও প্রাক্কলনের ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। ফলে নানা ভোগান্তির মধ্যে প্রশিক্ষণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন প্রশিক্ষণার্থীরা।
এখানকার অভিভাবক বীথি আকতারসহ আরও কয়েকজন জানান, এ প্রতিষ্ঠানে কোনো নিয়ম নেই। মনগড়াভাবে চলছে এ প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের দোলনাগুলো পরিত্যক্ত পড়ে আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক বলেন, ‘আমাদের ট্রেনিং শেষে ভাতা দেওয়ার নিময় থাকলেও এখনো কোনো ভাতা পাইনি। শুনেছি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেবে। আর খাবারের জন্য আমাদের বরাদ্দ কত টাকা, সেটা আমরা জানি না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজশাহী বিভাগ থেকে আসা একাধিক ইনস্ট্রাক্টর বলেন, ‘পিটিআইয়ের ভেতর থাকার ব্যবস্থা না থাকায় আমাদের বাইরে হোটেলে থাকতে হচ্ছে। আর নারী কর্মকর্তাদের মহিলা হোস্টেলে রাখার ব্যবস্থা করা হলেও সেখানে কোনো পরিবেশ নেই। হোস্টেলের ভেতরটা গন্ধ আর স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে। এ ছাড়া ফ্যান নষ্ট, অধিকাংশ খাট ভাঙা অবস্থায় আছে। আমাদের সবাইকেই বাইরের হোটেলে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী বলেন, সুপার স্যার যোগদানের পর থেকে তিনি গেস্টরুমে থাকছেন। গত বছর তার বাসভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করার জন্য অনেক চেষ্টা করেন। তবে গণপূর্ত বিভাগ থেকে একটি পরিদর্শক দল সেটি সংস্কার করে বসবাসের উপযোগী বলে মতামত দেয়।
কিন্তু তিনি সংস্কারের উদ্যোগ না নিয়ে গেস্টরুমেই থাকছেন নামমাত্র ভাড়া দিয়ে। এ ছাড়া তিনি প্রশিক্ষণে পুরোনো ব্যানার ব্যবহার করেন। ভুয়া বিল-ভাউচার দিয়ে বিভিন্ন অর্থ উত্তোলন করেন।
অডিটর জয়ন্ত বলেন, ‘আমরা বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান অডিট করেছি। কুড়িগ্রাম পিটিআই এ অর্থ তছরুপের বিষয়ে অসংগতি পাওয়া গেছে। তা আমরা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি।’
কুড়িগ্রাম সুপারিনটেনডেন্ট জয়নুল আবেদীন অডিট টিমের অডিটে অসংগতির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘সেগুলোর বিষয়ে আমি যথাযথ উত্তর দিয়েছি।’
প্রশিক্ষণার্থীদের ভাতা প্রদানের বিষয়ে বলেন, বরাদ্দ এলে তাদের মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দেওয়া হবে। আর বাসভবনটি পরিত্যক্ত হওয়ায় তিনি গেস্টরুমে থাকার কথা স্বীকার করেন। তবে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।