কোরবানি ঈদের বাকি আর মাত্র দুই সপ্তাহ। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে জমে উঠতে শুরু করেছে পশুর হাটের হাঁকডাক। নগরের বিভিন্ন এলাকায় চলছে প্রস্তুতি। গরু-ছাগলের খামারি, ব্যাপারী ও ইজারাদারদের ব্যস্ততাও বেড়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) এরই মধ্যে তাদের তিনটি স্থায়ী পশুর হাটের ইজারা প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে। তবে উৎসবের এই প্রস্তুতির মাঝেই সামনে এসেছে ভিন্ন এক বাস্তবতা। স্থায়ী হাটগুলো চড়া দামে ইজারা হলেও অস্থায়ী হাটগুলোর ইজারা মূল্যে বড় ধরনের ধস নেমেছে। ফলে বড় অংকের রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে চসিক।
চসিকের রাজস্ব বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তিনটি স্থায়ী পশুর হাট ইজারা দিয়ে এবার সংস্থাটির আয় হচ্ছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে নগরের সবচেয়ে বড় পশুর হাট সাগরিকা এবার ৮ কোটি ৮ লাখ ৫ হাজার ৭৮৬ টাকায় ইজারা পেয়েছেন ফজলে আলিম চৌধুরী।
অন্যদিকে, মুরাদপুরের বিবিরহাট ৬৮ লাখ ১০ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন মো. ইসমাইল। তবে বিবিরহাটের এই দর গত বছরের তুলনায় অনেক কম। ২০২৫ সালে এই হাট ১ কোটি ১৬ লাখ টাকায় ইজারা হয়েছিল। এ ছাড়া পোস্তারপাড় ছাগলের বাজার ১ কোটি ২১ লাখ ৭৮ হাজার ৭৮৬ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে।
চসিকের অনুমোদিত মোট ২২টি হাট-বাজার রয়েছে। এর মধ্যে ৬টি পশুর হাট। এসব হাট-বাজার থেকে বড় একটি অংশ বার্ষিক রাজস্ব আয় করে থাকে চসিক। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সময়মতো ইজারা সম্পন্ন না হলে কিংবা প্রত্যাশিত দর না উঠলে সিটি করপোরেশনকে বড় অঙ্কের রাজস্ব ঝুঁকিতে পড়তে হবে।
অস্থায়ী হাটের অবস্থা আরও নাজুক। কর্ণফুলী অস্থায়ী পশুর হাটে (১ কি মি) সর্বোচ্চ ২ কোটি ১২ লাখ টাকা দর পাওয়া গেছে। মুসলিমাবাদ মাঠে দর উঠেছে মাত্র ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। আর ওয়াজেদিয়া হাটে কোনো দরপত্রই জমা পড়েনি। ২০২০ সালের পর এবারই সবচেয়ে কম ধর পড়েছে অস্থায়ী পশুর হাটে।
সাগরিকা বাজারের ইজারা প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, নানা জটিলতায় এখন আর আগের মতো লাভ হচ্ছে না। তাদের মতে, অনলাইনে পশু বিক্রি ও ভাগা কোরবানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হাটের ওপর চাপ কমছে।
পাড়া-মহল্লায় প্রভাবশালীদের অবৈধ হাট বসানোয় বৈধ হাটে ক্রেতা কমছে। মানুষ সরাসরি খামার থেকে পশু কেনায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। নিরাপত্তা, সিসিটিভি, কর্মী নিয়োগ ও হাসিল বুথ তৈরিতে বিপুল খরচ বাড়ছে।
অবৈধ হাট ও ইজারাদারদের শঙ্কা প্রসঙ্গে চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন বলেন, ‘অনুমোদিত হাটের বাইরে যত্রতত্র বাজার বসানোর কোনো সুযোগ নেই। প্রতিবছরের মতো এবারও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অবৈধ হাট উচ্ছেদ করা হবে।’ তিনি বলেন, বৈধ হাটে জাল টাকা শনাক্তকরণ মেশিন, সিসিটিভি, পশু চিকিৎসাসেবা এবং পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকবে, যা অবৈধ হাটে পাওয়া সম্ভব নয়।
সাগরিকা পশুর হাটের ইজারাদার ফজলে আলিম চৌধুরী বলেন, ‘৮ কোটি দিয়ে বাজার ইজারা নিয়ে ওই টাকা আয় হবে কি না সেই শঙ্কায় রয়েছি। যদিও ইজারার ৭০ শতাংশ আয় পশুর হাট থেকে আসার কথা। বাকি ৩০ শতাংশ আসবে পুরো বছরে। উত্তরবঙ্গ থেকে যদি গরু না আসে, তা হলে পুরো টাকাই লস যাবে।’
সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামাল বলেন, অবৈধ পশুর হাটের কারণে রাজস্ব হারায় চসিক। তাই এবার কঠোর অবস্থানে রয়েছি। চাঁদাবাজি, পেশিশক্তির প্রয়োগ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, যানজট সৃষ্টি, পশুর গোবর পরিষ্কার না করা, ক্রেতা-বিক্রেতার নিরাপত্তাহীনতাসহ অনেক সমস্যা সৃষ্টি করে অবৈধ পশুর হাট।
তাই অবৈধ কোরবানির পশুর হাট বসতে দেওয়া হবে না। হাটের নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি জানান, চসিকের অনুমোদিত হাটগুলোতে জাল টাকার বুথ শনাক্তকরণ মেশিন, সিসিটিভি ক্যামেরা, পশু চিকিৎসাসেবা, পর্যাপ্ত আলোকায়ন, গোখাদ্য সরবরাহ, গরু বাঁধার ছাউনি, পশুর গোবর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাম্প ও টহল নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সংস্থা দায়িত্ব পালন করবে।