ব্যবসায়ী হুমায়ুন কবিরকে গুমের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪২ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া গত ১২ বছরে বিভিন্ন সময়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ৬ কর্মীকে গুমের ঘটনায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ও পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী হুমায়ুন কবির নিজেই অভিযোগ করেন। গুম হওয়া ছাত্রশিবির কর্মীদের পক্ষে তাদের পরিবার অভিযোগ দায়ের করে।
সোমবার (২১ অক্টোবর) ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে অভিযোগ দুটি করা হয়।
৬ ছাত্রশিবির গুমের ঘটনায় অভিযোগ দায়েরের পর ছাত্রশিবিরের আইন সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান ও আইনজীবী আমানুল্লাহ আদিব সাংবাদিকদের জানান, গত প্রায় ১২ বছর ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতনের স্টিমরোলার চালিয়েছে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার। মামলা-হামলা, হত্যাসহ অসংখ্য নেতা-কর্মীকে গুম করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬ জন এখনো গুম আছেন। ওই ছয়জনকে খুঁজতে পরিবারের সদস্যরা গত ৬ আগস্ট র্যাব সদর দপ্তরে গিয়েছিলেন। কর্তৃপক্ষ তাদের সহযোগিতা করবে বলে জানালেও এখনো কোনো তথ্য দিতে পারেনি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গুম হওয়া ৬ নেতা-কর্মীর সন্ধান ও সেই সময়ের র্যাব-ডিবির কর্মকর্তাদের শাস্তি চেয়ে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিল করেছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। নিরাপত্তার স্বার্থে অভিযোগকারীদের নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না।
অভিযোগে বলা হয়, ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে গুম হন শিবিরকর্মী রিজওয়ান হোসেন। যশোরের বেনাপোল পোর্টসংলগ্ন দুর্গাপুর বাজার থেকে বেনাপোল পোর্ট থানার এসআই নূর আলম ও তার এক সহযোগী রিজওয়ানকে দিনে-দুপুরে তুলে নিয়ে যান। পরিবারের লোকজন দ্রুত থানায় গেলে ওসি অপূর্ব হাসান ওকে (রিজওয়ানকে) খুঁজতে নিষেধ করেন। নইলে পরিবারের বাকিদেরও একই অবস্থা হবে। পরে থানা কোনো মামলা নেয়নি, উল্টো ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছে। এক দিন জানালেন রিজওয়ান তুরস্কে গেছে আইএসে যোগ দিতে। রিজওয়ানরা চার ভাই। অপর তিন ভাই লেখাপড়া করেননি, তারা কষ্ট করে রিজওয়ানকে পড়ালেখা করিয়েছেন।
২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে হানিফ এন্টারপ্রাইজের ৩৭৫০ নম্বর গাড়িতে করে ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে মধ্যরাতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামি স্টাডিজ বিভাগের ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ছাত্রশিবিরের সাবেক অর্থ সম্পাদক মো. ওয়ালীউল্লাহ এবং ফিকাহ বিভাগের ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ছাত্রশিবিরের সাবেক সাংস্কৃতিক সম্পাদক আল মুকাদ্দাসকে আশুলিয়ার নবীনগর থেকে র্যাবের পোশাক পরা ব্যক্তিরা আটক করে নিয়ে যান। এরপর বিভিন্ন থানা ও র্যাব সদর দপ্তরে বহুবার যোগাযোগ করে তার খোঁজ পাননি পরিবারের সদস্যরা।
২০১৩ সালের ২ এপ্রিল রাত ৪টায় সাদা পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শ্যামলী রিং রোডের ১৯/৬ টিক্কাপাড়ার বাসা থেকে হাফেজ জাকির হোসেনকে আটক করে নিয়ে যায়। ১১ বছর পেরিয়েও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
একই বছরের অক্টোবর মাসের ২৩ তারিখে বান্দরবান সদরের ৩ নং ওয়ার্ড থেকে ছাত্রশিবিরের সদস্য জয়নাল হোসেনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। ২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল ঝিনাইদহের সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা মেধাবী ছাত্রশিবিরের কর্মী মু. কামরুজ্জামানকে ঝিনাইদহ সদরের লেবুতলা থেকে ডিবি পরিচয়ে নিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে সংগঠন ও তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের সন্ধানে বিভিন্ন সরকারি ও মানবাধিকার সংস্থায় অভিযোগ জানিয়েও কোনো ফল পাচ্ছে না।
ব্যবসায়ী হুমায়ুন কবির শেখ হাসিনাসহ যে ৪২ জনের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ আনেন তাদের মধ্যে রয়েছেন হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ, সাবেক ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া।
অভিযোগে বলা হয়, ২০১৮ সালের ২৭ অক্টোবর হুমায়ুন কবিরকে তুলে নিয়ে আয়নাঘরে ১১ দিন বন্দি করে রাখা হয়। এ সময় তাকে বৈদ্যুতিক শক, হাত-পা ও চোখ বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে নির্যাতন করা হয়।