নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ২৭টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয়। এসব গ্যাং মাদক ব্যবসা, ভূমি দখল, চাঁদাবাজি, খুন, ধর্ষণসহ নানা অপরাধে জড়িত। বিভিন্ন সময়ে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। গ্যাং সদস্যদের বয়স কম হলেও তাদের হাতে দেশি-বিদেশি অস্ত্র রয়েছে। স্থানীয়রা প্রতিবাদ করলেই ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালালেও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় এসব অপরাধী গ্রেপ্তার হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধ দমনে সচেষ্ট রয়েছে।
রাজধানীর উপকণ্ঠে সাতটি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত রূপগঞ্জ উপজেলা। এতে রয়েছে অসংখ্য শিল্প-কারখানা ও পূর্বাচল উপশহর। এখানে সারা দেশের মানুষের যাতায়াত রয়েছে। শিল্প-কারখানা, আবাসন প্রকল্পে বালু ভরাট, জমি দখল, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারে রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় অন্তত ২৭টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ গড়ে উঠেছে। এই গ্যাংগুলোর কারণে রূপগঞ্জ উপজেলায় বাড়ছে হানাহানি ও সংঘাত। মাদক বিক্রি-সেবন, খুন, ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা। দিন দিন তাদের অপরাধবোধ বেড়ে চলেছে। এমনকি দিনের আলোতে তাদের অপকর্ম চালানো হচ্ছে।
বিগত সরকারের শাসনামলে ও সরকার পতনের পর রূপগঞ্জের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে এসব কিশোর গ্যাং। তাদের সংখ্যা ৪০০-এরও বেশি। এই গ্যাংগুলোর কাজ হলো এলাকায় মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, ভূমি দখল, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণসহ নানা অপরাধের মাধ্যমে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করা। এসব গ্যাংয়ের পেছনে থাকেন এলাকার রাজনৈতিক বড় ভাইয়েরা। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর তথাকথিত বড় ভাইয়েরা গা ঢাকা দিলেও বর্তমানে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের ছত্রচ্ছায়ায় এসব অপরাধী আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে রূপগঞ্জের তারাব এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে শিমুল ও শ্রাবণ গ্রুপের মধ্যে কথা-কাটাকাটি, বাগবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কি হয়। একপর্যায়ে দুই গ্রুপের লোকজন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এই সংঘর্ষে শ্রাবণ গ্রুপের রাশেদুল ইসলাম ও জুনায়েদ আহমেদ হৃদয় ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হয়। পরে তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। এ ঘটনার পর আবারও সামনে আসে কিশোর গ্যাংগুলোর অপরাধ। যেসব বয়সে হাতে থাকার কথা বই-খাতা, সেই বয়সেই হাতে দেশি-বিদেশি অস্ত্র থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে।
রূপগঞ্জে বিভিন্ন কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। যেমন: কিং মাস্টার, শুটার গ্রুপ, গুই গ্রুপ, ডি কোম্পানি, টাইগার গ্যাং, টেনশন গ্যাং, ডেঞ্জার গ্রুপ, শাওন গ্রুপ, সুইচ গ্রুপ, স্যাভেজ গ্রুপ, কুড়াল গ্রুপ, পিনিক গ্যাং, হাতুড়ি গ্যাং, সজীব গ্যাং, আমির গ্যাং, ইভান গ্যাং, পাটানী গ্যাং, আলেক্স গ্রুপ, সেভেন স্টার গ্রুপ, ইয়াং স্টার, ব্লেড গ্যাং, কসাই গ্যাং, লাদেন গ্যাং এবং বাবা গ্যাং। এসব গ্যাং বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মুড়াপাড়ায় চারটি, তারাব পৌরসভায় পাঁচটি, কাঞ্চন পৌরসভায় তিনটি, ভুলতা ইউনিয়নে দুটি, গোলাকান্দাইল ইউনিয়নে দুটি, রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়ন এবং ৩০০ ফুট সড়ককেন্দ্রিক দুটি, ভোলাব ইউনিয়নে দুটি, দাউদপুর ইউনিয়নে দুটি, কায়েতপাড়া ইউনিয়ন ও চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঁচটি গ্যাং গ্রুপ তাদের আধিপত্য বিস্তার করছে।
প্রতিবাদ করলেই ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। গুম, খুন, পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা, বাড়িঘরে লুটপাট, ভাঙচুর, জমি দখলসহ নানা পন্থায় প্রতিবাদকারীদের জীবনকে বিষিয়ে তোলে এসব কিশোর গ্যাং। ফলে স্থানীয়রা ভয়ে এসব গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কথা বলছেন না। অপরাধী কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে মামলা করলেও রাজনৈতিক গডফাদারদের কারণে সঠিক বিচার পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা।
২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল ভুলতা স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে প্রেমসংক্রান্ত ঘটনায় দুই কিশোরের মধ্যে সংঘর্ষে সজীব নামে এক কিশোর নিহত হয়। ২৭ সেপ্টেম্বর দাউদপুরের দুয়ারা এলাকায় ঘুম ভেঙে দেওয়ার কারণে ছোট ভাই জামিল বড় ভাই আশরাফুলকে হত্যা করে। একই বছর ১৩ নভেম্বর ভোলাব ইউনিয়নের পাইস্কা এলাকায় তিন কিশোর তাদের বন্ধু কিশোর মাওলাকে হত্যা করে। ২০২২ সালের ১৭ জুন চনপাড়া পুনর্বাসন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কিশোর দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে সজল নামে এক কিশোর নিহত হয়। ২০২১ সালের ৩ আগস্ট গোলাকান্দাইল বেড়িবাঁধ এলাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে দুই কিশোর গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে সানি নামে এক কিশোর নিহত হয়। ২০২০ সালে কিশোরদের হাতে কায়েতপাড়া এলাকায় আনোয়ার হোসেন ও শিংলাব এলাকায় কিশোর সাইফুল ইসলামের হাতে তার মা দেলোয়ারা বেগম নিহত হন।
কলামিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশের মহাসচিব লায়ন মীর আব্দুল আলীম বলেন, ‘কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে যাওয়া, সামাজিক অবক্ষয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘কিশোর ও যুবকদের মাদকের আগ্রাসন থেকে দূরে রাখতে হবে। মাদকসেবীরা প্রায় সব ধরনের অপরাধে জড়িত হতে পারে।’ কিশোর ও যুবকদের কাউন্সেলিংয়ের পরামর্শ দেন তিনি। এ ছাড়া তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হওয়ার আহ্বান জানান।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী ইসলাম বলেন, ‘অপরাধী যে বা যারাই হোক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। রূপগঞ্জে কোনো অপরাধীর জায়গা হবে না।’ মাদক, কিশোর গ্যাংসহ নানা অপরাধ দমনে প্রায়ই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এসব অপরাধে কয়েকজনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।’