চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন স্থানে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র দিয়ে অপরাধ করছে সন্ত্রাসীরা। কোথাও কোথাও রাতে গুলি ছোড়া হচ্ছে, কোথায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, আবার কোথাও চাঁদাবাজি, দখলবাজিতে কাজে লাগানো হচ্ছে এসব অস্ত্র। কোথাও আবার ভাড়া খাটারও তথ্য মিলছে।
সিএমপির থানাগুলো থেকে লুট হওয়া ১৬১টি অস্ত্র বিগত সাত মাসেও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। ফলে জনমনে একধরনের উদ্বেগ-আতঙ্ক রয়ে গেছে। যেকোনো সময় এসব অস্ত্র ব্যবহার করে খুনসহ বড় ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারে সন্ত্রাসীরা, এমনটাই আশঙ্কা করছে পুলিশ ও স্থানীয় জনসাধারণ।
সম্প্রতি পুলিশও লুট হওয়া অস্ত্র দিয়ে অপরাধ করার প্রমাণ পেয়েছে। এমনকি ঘটনাস্থল থেকে একটি অস্ত্রও উদ্ধার করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় দুই জামায়াতের কর্মী নিহত হওয়ার আগে তারা নিজেরাই অস্ত্র দিয়ে প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। সেই অস্ত্র নগরের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র বলে অস্ত্রের বডি নম্বর মিলিয়ে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। অস্ত্রটি ছিল ব্রাজিলিয়ান ট্ররাস টিএএইচ মডেলের। ছয় ইঞ্চি ছোট এই পিস্তলের ২টি ম্যাগাজিনে রাখা যায় ১৭ রাউন্ড গুলি।
জেলা পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, এটি সিএমপির কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র। লুটের এই পিস্তল দিয়ে গুলি করতে করতে একসময় এর সব গুলি শেষ হয়ে যায়। পুলিশের কাছ থেকে লুট হওয়া এই অস্ত্র প্রদর্শিত হয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, থানার পিস্তলের সঙ্গে ওই পিস্তলের সাদৃশ্য রয়েছে। পুলিশের সূত্রে জানা গেছে, থানা থেকে লুট হওয়া ১৬১টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি।
জানা গেছে, হাসিনা সরকারের পতনের দিন ৫ আগস্ট দুপুরের পর সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেও হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে উল্লাস করেন। ওই দিন নগরের কোতোয়ালি, ডবলমুরিং, ইপিজেড, খুলশীসহ ৮টি থানা ও ফাঁড়িতে আগুন দেওয়া, ভাঙচুর, লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সেই সময় থানাগুলো থেকে প্রায় ৯৪৮টি অস্ত্র, ১২ হাজার গুলি লুট হয়।
এরপর গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর অস্ত্রগুলো জমা দেওয়ার সুযোগ দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, যারা এসব অস্ত্র নিয়েছেন তারা নির্দিষ্ট কোনো স্থানে রেখে কল করলেও পুলিশ সেই অস্ত্র উদ্ধার করবে। কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। অনেকে সেটি করলেও কেউ কেউ তা করেনি। তারা অস্ত্র নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছে। এরপর শুরু হয় অস্ত্র উদ্ধার অভিযান। সেই অভিযান এখনো চলছে।
সর্বশেষ গত ১ মার্চ নগরীর পাহাড়তলী রানী রাসমণি ঘাটের গোল চত্বর এলাকা থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র ও বুলেট উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া দুজন হলেন মাঈনুর ইসলাম মামুন (২০) ও মো. জামাল (২৬)।
উদ্ধার করা অস্ত্রগুলো হচ্ছে পাহাড়তলী থানার মালখানা থেকে লুট হওয়া একটি বিদেশি রিভলবার ও ৬ রাউন্ড বুলেট। এতদিন এই রিভলবার ও বুলেট ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ছিনতাইকারীরা চট্টগ্রাম শহরের রাস্তাঘাট, নির্জন এলাকার পথচারী, রিকশা কিংবা অটোরিকশার যাত্রীদের ছুরি ঠেকিয়ে ওই অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ছিনতাই করত। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদেও তারা নিজেরা এই বিদেশি রিভলবার এবং বুলেটগুলো থানার মালখানা থেকে লুট করেছিল বলে স্বীকার করেছে।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরে অস্ত্র উদ্ধারে সবচেয়ে এগিয়ে আছে পাহাড়তলী থানা। গত চার মাসে থানাটি বিভিন্ন অভিযানে ৯ এমএম পিস্তল, রিভলবারসহ বিভিন্ন মডেলের মোট ১২টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর বিকেলে পাহাড়তলীর খালপাড় থেকে দুটি রিভলবার এবং ১৬ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে পাহাড়তলী থানা-পুলিশ। এর আগে ৪ নভেম্বর একটি পিস্তল, মোটরসাইকেল ও সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে মাহবুবুর রহমান ও নুরনবী নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছে পুলিশের ইউনিফর্ম, হাতঘড়ি, জুতাসহ বেশ কিছু সরঞ্জাম পাওয়া গেছে।
গত বছরের ২৩ নভেম্বর ভোরে পাহাড়তলী থানা-পুলিশ মো. পারভেজ (২৮) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নগরের হাজি ক্যাম্প থেকে একটি বন্দুক উদ্ধার করা হয়। বন্দুকটি থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র। গ্রেপ্তার হওয়া পারভেজ ওই অস্ত্র দিয়ে আধিপত্য বিস্তার করছিল। ছড়িয়ে পড়া একটা ভিডিওতে দেখা যায়, গত ৬ আগস্ট পারভেজ একদল যুবককে নিয়ে একটি এলাকায় অস্ত্র হাতে ভোররাতে ঘুরছে। তার হাতে থাকা অস্ত্রটি একনলা দেশীয় এলজি।
এ ছাড়া ৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় মো. মালেক প্রকাশ মাইল্ল্যা (২৫) ও মো. বিজয় (২২) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাদের নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে নামে। এ সময় পাহাড়তলীর নয়াপাড়া রেললাইনের পূর্ব পাশের পোড়া বাড়িসংলগ্ন খালি জায়গা থেকে একটি অস্ত্র ও তিন রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করে পুলিশ।
গত ২০ ফেব্রুয়ারি সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে অস্ত্রধারী দুই গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। ওই দিন সেখানে অস্ত্র সাপ্লাই দিতে গিয়ে বেলাল হোসেন নামের এক যুবক পাহাড়তলী থানা-পুলিশের কাছে ধরা পড়ে। ওই যুবক জানান, তিনি শুধু অস্ত্র বহন করছিলেন। তাকে আল আমিন নামের একজন হত্যার হুমকি দিয়ে পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে দুটি এলজি সলিমপুরের রিদোয়ানের কাছে পৌঁছে দিতে বলে। পথে পুলিশের চেকপোস্টে তিনি ধরা পড়েন।
এদিকে গত ২২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় নগরের ফিরিঙ্গিবাজারের ব্রিজঘাট এলাকা থেকে ছাত্রলীগের দুই নেতাকে গ্রেপ্তার করে কোতোয়ালি থানা-পুলিশ। তাদের কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল এবং ৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
অন্যদিকে নগরের চান্দগাঁও থানার বাড়াইপাড়া এলাকায় রাতে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। পুলিশ এটা জানলেও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করতে পারছে না। নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায়ও চাঁদাবাজি, দখলবাজি, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পক্ষে-বিপক্ষে অস্ত্রের মহড়া চলে। গত ২ ফেব্রুয়ারি শীর্ষ সন্ত্রাসী মিজান ও ছোট সাজ্জাদের মধ্যে গোলাগুলির প্রস্তুতির সময় তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে দুটি অবৈধ বিদেশি পিস্তল, ৯ রাউন্ড গুলি ও দুটি ম্যাগাজিনসহ ছোরা এবং অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। তবে শীর্ষ সন্ত্রাসী মিজান ও ছোট সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
পাহাড়তলী থানার ওসি বাবুল আজাদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘কী পরিমাণ অস্ত্র লুট হয়েছে তা এখনই বলতে পারছি না। তবে আমরা গত চার মাসে ১২টি অস্ত্র ১৬ রাউন্ড গুলি, তিন রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করেছি। প্রত্যেকটি ঘটনায় দু-একজন করে গ্রেপ্তার হয়েছে। অবৈধ ও থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। চেকপোস্টের মাধ্যমেও তল্লাশি চালাচ্ছি।’
অবৈধ ও থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র নানা অপরাধে ব্যবহৃত হওয়ার কথা স্বীকার করে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মো. রইছ উদ্দিন বলেছেন, ‘থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রগুলো যেন কোনোভাবেই পেশাদার অপরাধীদের কাছে না যায় সে ব্যাপারে আমাদের নিয়মিত তৎপরতা রয়েছে। আমরা গোপনে তথ্য সংগ্রহ করছি কাদের কাছে এসব অস্ত্র যেতে পারে।’
নগর পুলিশের জনসংযোগ শাখার অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মাহমুদা বেগম বলেন, নগরে এখন পর্যন্ত কী পরিমাণ লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করা গেছে সেই তথ্য দিতে সময় লাগবে। কেননা, অনেক ধরনের অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এটা বলতে পারি, অস্ত্র উদ্ধারে আমাদের অভিযান নিয়মিত চলছে। থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রও পাওয়া গেছে, কিছু আলামতের অস্ত্রও পাওয়া গেছে।
আমরা সতর্ক আছি যেন এসব অস্ত্র দিয়ে কোনো অপরাধের ঘটনা না ঘটে। পুলিশের এই কর্মকর্তা সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে না পারলেও নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর নগরের ৮ থানা ও ফাঁড়ি থেকে ৩০০ পিস্তলসহ ৯৪৮টি অস্ত্র ও ১২ হাজার গুলি লুট হয়। এর বেশির ভাগ উদ্ধার করা গেলেও এখনো ১৬১টি অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি।