আসন্ন রমজানে যাতে মুরগি ও ডিমের দাম অসহনীয় পর্যায়ে না যায়, এ জন্য ভোক্তাদের কথা বিবেচনা করে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের খামারিরা রাজধানীর এক শ পয়েন্টে ন্যায্যমূল্যে মুরগি ও ডিম বিক্রি করবেন।
প্রতিবছরই রমজানের সময় বহুল প্রচলিত পণ্য যেমন: ছোলা, বুট, খেজুরের দাম অস্বাভাবিক পর্যায়ে বেড়ে যায়। দাম নিয়ন্ত্রণে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাজার মনিটরিংও করে। কিন্তু পোলট্রি মুরগি আর ডিমের বাজার কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনা যায় না।
দেশের বাজার ব্যবস্থার এমন অবস্থায় এবার আগেভাগে মাঠে কাজ করতে শুরু করতে চায় বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ)। সংগঠনটির ১৭ হাজার প্রান্তিক খামারিরা এবার রমজানে ন্যায্যমূল্যে ভোক্তা পর্যায়ে মুরগি আর ডিম বিক্রি করবেন।
যোগাযোগ করা হলে সংগঠনটির সভাপতি সুমন হাওলাদার খবরের কাগজকে বলেন, পোলট্রি মুরগি আর ডিমের বাজার এখন পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করেন করপোরেট খামারিরা। তারা এককভাবে এ বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের কারণে প্রান্তিক খামারিরা ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘শুধু খামারি নয়, করপোরেট খামারিদের কারণে ভোক্তারাও ন্যায্যমূল্যে মুরগি ও ডিম পাচ্ছেন না। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা চাই এবারের রমজানে ভোক্তারা যেন ন্যায্যমূল্যে মুরগি ও ডিম কিনতে পারেন। এ জন্য আমরা প্রান্তিক খামারিদের কাছ থেকে মুরগি ও ডিম সংগ্রহ করে রাজধানীর একশ পয়েন্টে বিক্রি করব।’ এ জন্য প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা চেয়েছেন সুমন হাওলাদার।
এ বিষয়ে সুমন হাওলাদার আরও বলেন, ‘আসন্ন রমজান মাস উপলক্ষে ডিম এবং মুরগির বাজারে স্বস্তি ফেরাতে আমরা এ উদ্যোগ নিয়েছি। বাজারে সঠিক দাম নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশন স্মার্ট বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আগামী ১২ জানুয়ারি থেকে ১০০ পয়েন্টে সীমিত লাভে ডিম, ফ্রোজেন মুরগি এবং অন্যান্য কৃষিজাত পণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রয়ের কার্যক্রম শুরু করবে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের ব্রান্ডক্স এগ্রোর মালিক বাপ্পি কুমার দে খবরের কাগজকে বলেন, প্রান্তিক খামারিরা দেশের মোট চাহিদার ৮০ শতাংশ ডিম ও মুরগির চাহিদা পূরণ করে থাকে। মাত্র ২০ শতাংশ করপোরেট গ্রুপের মাধ্যমে পূরণ করা হয়। তবুও করপোরেট গ্রুপগুলোর কৌশলগত বাজার নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রান্তিক খামারিদের টিকে থাকা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, ‘করপোরেট গ্রুপগুলো এক জায়গাতেই কয়েক লাখ ডিম উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু প্রান্তিক খামারিদের কাছ থেকে এক থেকে দুই লাখ ডিম সংগ্রহ করতে হলে কয়েকজন খামারি লাগবে। বাজার ব্যবস্থায় যেখানে একসঙ্গে চাহিদার সব পাওয়া যায়, সেখানেই সবাই ভিড় করে। যার কারণে আমরা চাহিদা সিংহভাগ পূরণ করলেও খুচরা ব্যবসায়ীরা করপোরেট গ্রুপগুলোর ওপর নির্ভর করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন আমরা চেষ্টা করছি প্রান্তিক খামারিরা একত্রিতভাবে করপোরেট ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে ভোক্তাদের ন্যায্যমূল্যে পণ্য সরবরাহ করতে।’
বাগেরহাটের সরদার পোলট্রি ফার্মের মালিক সরদার আবদুল্লাহ খবরের কাগজকে বলেন, প্রান্তিক খামারিদের প্রতি পিস ডিমের উৎপাদন খরচ সাড়ে ১০ টাকা থেকে ১১ টাকা, ব্রয়লার মুরগি কেজিতে খরচ ১৫৫ টাকা থেকে ১৭০ টাকা।
সোনালি মুরগি উৎপাদন খরচ প্রতি কেজিতে ২৪০ টাকা থেকে ২৬০ টাকা। অথচ করপোরেট গ্রুপের প্রতি পিস ডিমের উৎপাদন খরচ ৮ টাকা থেকে ৯ টাকা। ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ ১৩০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা। সোনালি মুরগি উৎপাদন খরচ ২০০ টাকা থেকে ২২০ টাকা। করপোরেট গ্রুপের উৎপাদন খরচ কম হলেও তারা বেশি দামে পণ্য বিক্রি করে মুনাফা করে, আর প্রান্তিক খামারিদের উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ার তারা টিকে থাকতে পারছে না।
কেন পারছে না এর জবাবে সরকার দার আবদুল্লাহ বলেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু খামারের বিনিয়োগ করে না, তার ফিডে (মুরগির খাবার) বিনিয়োগ করে। তাদের কোম্পানির খাবার নগদে কিনলে ৩০০ টাকা ছাড়া পাওয়া যায় আর বাকিতে কিনলে প্যাকেটের গায়ের দামের সঙ্গে ২০০ টাকা বেশি দিতে হয়। প্রান্তিক খামারিতের ক্ষেত্রে নগদে সব সময় খাবার কেনা সম্ভব হয় না। ফলে প্রান্তিক খামারিদের উৎপাদন খরচ সব সময়ে বেশি থাকে।
জয়পুরহাটের ফিড অ্যান্ড মিট প্রতিষ্ঠানের মালিক মেজবাউল মারফি বলেন, যখন ডিম বা মুরগির দাম বৃদ্ধি পায়, তখন সারা দেশে তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত হস্তক্ষেপও দেখা যায়। কিন্তু ফিড বা মুরগির বাচ্চার দাম বাড়লে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয় না। ফিড ও বাচ্চার দাম বাড়লে এর সরাসরি প্রভাব প্রান্তিক খামারির ওপর পড়ে। তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পায় না এবং তাদের উৎপাদন খরচ বাড়তে থাকে। এই অস্থিরতার কারণে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং তাদের জন্য টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
এক পরিসংখ্যান তুলে ধরেন বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, দেশে বছরে ৮০ লাখ টন ফিড উৎপাদিত হয়। প্রতি কেজি ফিডে যদি ৫ টাকা অতিরিক্ত মুনাফা করা হয় তাহলে এক টন ফিডে ৪ হাজার টাকা অতিরিক্ত মুনাফা হয়। এই হিসাবে ৮০ লাখ টন ফিডে কোম্পানিগুলো বছরে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত মুনাফা করছে। এ ছাড়া দেশে বছরে প্রায় ১০৪ কোটি মুরগির বাচ্চা উৎপাদিত হয়। প্রতি বাচ্চায় যদি ২০ টাকা করে অতিরিক্ত মুনাফা করে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো তাহলে প্রান্তিক খামারিদের কাছ থেকে বছর প্রায় ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা অতিরিক্ত মুনাফা নিচ্ছে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো।
সুমন হাওলাদার বলেন, ‘যদি এ অবস্থা অব্যাহত থাকে তবে পোলট্রিশিল্পের সংকট আরও প্রকট হবে। এবং আমাদের খাদ্য ব্যবস্থা এবং কৃষি খাতের টেকসই উন্নতি ব্যাহত হবে। এ খাতের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৫০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে।’