অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তরুণদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, অনলাইন ব্যবসা ও সৃজনশীল অর্থনীতিকে উৎসাহ দিতে কর-সুবিধা ও নীতিগত-সহায়তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি সেবাকে পুরোপুরি ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে নাগরিকরা ঘরে বসেই অধিকাংশ সরকারি সেবা নিতে পারেন।
গতকাল সোমবার রাজধানীর ফার্মগেটে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের যৌথ আয়োজনে ‘সংখ্যার বাহিরে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গড়া’ শীর্ষক ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সিজিএসের সভাপতি সাংবাদিক জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি) বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান কে এম মুজিবুল হক, অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান, বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ড. মুহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, ট্রান্সকম লিমিটেডের সিইও সিমিন রহমানসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের বিজনেস স্কুলের ডিন অধ্যাপক এম এ বাকী খলিলী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিকে নতুন কাঠামোয় এগিয়ে নিতে সরকার ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। গ্রামীণ কারুশিল্প, কুটিরশিল্প, চিত্রকলা, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করা হবে। এসব খাতে কর্মরতদের জন্য আর্থিক সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও বিপণন সুবিধা দেওয়া হবে, যাতে তারা আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতা করতে পারেন।
তিনি জানান, সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে এ বরাদ্দ আরও বাড়ানো হবে। পাশাপাশি পূর্বাচলে একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক থিয়েটার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে সিনেমা, নাটক, সংগীত, শিল্পকলা ও স্ট্রিট ফুডসহ নানা আয়োজন থাকবে। এর মাধ্যমে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও সম্প্রসারিত হবে।
ডিজিটাল সেবার প্রসঙ্গে আমির খসরু বলেন, সব সরকারি সেবা ধাপে ধাপে অনলাইনে নিয়ে আসা হবে। এতে কর ফাঁকি ও দুর্নীতি কমবে, নাগরিকদের সময় ও ভোগান্তি হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে শক্তিশালী ইন্টারনেট অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে অনলাইন ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং ও কল সেন্টার খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে স্টার্টআপ উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য কর-সুবিধা রাখা হয়েছে। বিদেশ থেকে আয় দেশে আনার প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে। পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত আয় দেশে আনতে কোনো জটিলতা থাকবে না। আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মগুলোও বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করছে, যা তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি কঠিন সময় অতিক্রম করছে। অতীতের ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারের অনিয়ম, অর্থ পাচার এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব এখনো অর্থনীতিতে বিদ্যমান। তাই অর্থনীতিকে ভঙ্গুর অবস্থা থেকে স্থিতিশীল পর্যায়ে আনতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে।
তিনি বলেন, ‘আমি যদি বলি আগামীকাল সকালেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, তাহলে সেটি বাস্তবসম্মত হবে না। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে দুই বছর সময় প্রয়োজন। তৃতীয় বছর থেকে প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক ফল দেখা যাবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্বাধীন ও পেশাদার কমিশনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইন ও সংস্কার কার্যক্রম চলছে। এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং আগামী দুই বছরের মধ্যে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। কারণ পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থায় যোগ্যতার ভিত্তিতে লোক নিয়োগ করা হয়েছে। বড় বড় বিদেশি কোম্পানি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে চাচ্ছে। বড় বড় কোম্পানি আসা শুরু করেছে, তাদের ফান্ড ম্যানেজাররা আসা শুরু করেছে। জেপি মরগান আমার সঙ্গে দেখা করেছেন। তারা বিনিয়োগ করতে চায়। দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। সবার জন্য বড় ধরনের সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্যে অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে সরকার ডিরেগুলেশনের পথে এগোচ্ছে। ব্যবসা সহজ করতে লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সরল করা এবং আমদানিতে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের সংস্কারে কেউ বাধা সৃষ্টি করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে। দেশ হিসেবে আমরা অনেক সাফার করেছি। সত্যি বলতে বাংলাদেশের মানুষ এখন মুক্ত জীবন চায়।’
সভায় ইউএপির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান কে এম মুজিবুল হক বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করপোরেট করহার কমাতে হবে। মুনাফাবিহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিদ্যমান করহার পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান বলেন, ‘বাজেট বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে মানুষ। আমরা সংখ্যার কথা বলব, আমরা উপাত্তের কথা বলব, আমরা অর্থ বরাদ্দের কথা বলব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা দেখতে চাইব– এগুলো মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কতখানি সাহায্য করেছে।’
মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক এম এ বাকী খলিলী ব্যক্তিশ্রেণির নতুন করকাঠামোর সমালোচনা করে বলেন, এতে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর করের চাপ বাড়বে। তাদের সঞ্চয় প্রবণতা কমে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে না।