চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নে দেড় হাজার একর সংরক্ষিত বন উজাড় করে কাসাভা চাষ করা হচ্ছে। প্রায় এক যুগ আগে লাগানো গাছগুলো কেটে সাবাড় করে লাগানো হয়েছে কাসাভা। টিলার পর টিলার বন ধ্বংস করে লাগানো হচ্ছে কাসাভা। স্থানীয়দের মতে, কাসাভা চাষ করছেন স্থানীয় ও পাশের উপজেলার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাদের কাছ থেকে পাইকারি দামে কাসাভা নিয়ে যায় প্রাণ গ্রুপ। বিষয়টি স্থানীয় বিট কর্মকর্তা জানলেও এ থেকে প্রতিকার হয়নি। বন বিভাগ বন উজাড়ের দায় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করলেও খবরের কাগজ প্রতিনিধিদের সরেজমিন পরিদর্শনে জানা গেছে পাহাড়ি, বাঙালি এবং বন বিভাগের লোকজন মিলেমিশে বন উজাড় করছেন।
তথ্য বলছে, চট্টগ্রামের নারায়ণ ঘাট রেঞ্জের আওতায় উত্তর কাঞ্চননগর মৌজায় বন বিভাগের ৩ হাজার ৭৩৭ একর সংরক্ষিত বন রয়েছে। এর মধ্যে দেড় হাজার একরের বেশি টিলায় কাসাভা চাষ হয়েছে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে প্রায় শত বছরের পুরোনো শত শত একর সেগুন, আকাশমণি, গামারি, বহেড়ার বাগান উজাড় করে সেখানে ব্যাপকভাবে কাসাভা চাষ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কাসাভাচাষিরা বন বিভাগ থেকে একর হিসেবে ভাড়া নিয়ে কাসাভা চাষ করেছেন। প্রাণ গ্রুপ থেকে তারা চাষের খরচ পান। ফসল তোলার পর কেজি ১০ টাকা করে প্রাণ গ্রুপ কিনে নিয়ে যায়। যেহেতু বিক্রির দুশ্চিন্তা নেই, সে জন্য কাসাভা চাষের দিকেই চাষিরা ঝুঁকছেন। এমনকি কাসাভা চাষে সরকারি কর্মকর্তাদেরও জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
কাসাভা চাষে যেমনি ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য, তেমনি মরছে গবাদিপশুও। আবাস নষ্ট হওয়ায় বন্য প্রাণী খুবই ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেম বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। প্রাণ-প্রকৃতি সবই বিলুপ্ত। চারদিকে এখন শুধুই কাসাভা আর কাসাভা। এখন যে জাতের কাসাভা আবাদ হচ্ছে এটা যদি কোনো পশুপাখি খেয়ে থাকে, তা শরীরের জন্য ক্ষতিকারক। এতে শুকিয়ে যাচ্ছে হালদার পানির উৎস। বন উজাড় করে মরূকরণের কারণে প্রাকৃতিক পানির উৎসগুলোও শুকিয়ে যাচ্ছে।
ভরাট হয়ে যাচ্ছে খাল, ঝিরি, ছড়া ও ঝরনা। চাষাবাদে বিঘ্ন ঘটছে। প্রাকৃতিক মাছ প্রজননক্ষেত্র হালদার শাখা শুকিয়ে পরিণত হয়েছে গোচারণ ভূমিতে। হালদা গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, বনের সঙ্গে পানির সম্পর্ক আছে। যে পাহাড়ে যত বেশি গাছ থাকে, সেই পাহাড় তত বেশি পানি সংরক্ষণ বা ধারণ করবে। তা ছোট ঝরনার মাধ্যমে খালে এসে পড়ে। বন ধ্বংসের কারণে ঝিরি, ঝরনা, খাল শুকিয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। দেশের রুই-জাতীয় মাছের একমাত্র প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীতে পানি নেই। কারণ পানির উৎসগুলো নষ্ট হয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওলজি বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, কাসাভা একদিকে ওষুধ, আবার কিছু ক্ষেত্রে এর পাতা গবাদিপশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এমনকি বেশি খেলে পশুর মৃত্যুও হতে পারে। তবে আসল কারণ বের করার জন্য কাসাভা এবং ওই গাছের পাতা পরীক্ষা করা জরুরি।
সংরক্ষিত বন উজাড় করে কাসাভা চাষ কোনোভাবেই কাম্য নয়। জীববৈচিত্র্য এবং ইকোসিস্টেম রক্ষায় বন বড় ভূমিকা পালন করে। কিন্তু ইদানীং পাহাড়ি বন উজাড় করে একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পাহাড় ধ্বংসলীলায় মেতেছে। বন বিভাগও নীরব দর্শকের ভূমিকায়। আঙুল তুলছে একে অপরের দিকে। কর্মকর্তারা বলছেন, তারা পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছে অসহায়। তা হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কী ভূমিকা রেখেছে! আশা করছি, অচিরেই পাহাড় এবং বনখেকো এই অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। সরকার এসব অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বন, পাহাড় সুরক্ষিত হোক।