ঢাকা ৫ আষাঢ় ১৪৩৩, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
চকরিয়ায় বাক প্রতিবন্ধী যুবককে ধাক্কা দিয়ে পালালো গাড়ি বিশ্বকাপের পরই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলবেন নয়্যার কৌশলগত সম্পর্কের পথে ঢাকা-বেইজিং নিত্যপণ্যের বাজারে নেই মূল্যতালিকা মধুখালীতে দুইদিনে দুই মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুর কমল দাদার পাঠশালা এমপি আসলে আগে পায়ে একটা মেরে দিব: এমপির পিএ ও যুবদল কর্মীর অডিও ভাইরাল লেবাননে ইসরায়েলি হামলয় নিহত ১৬ মেহেরপুর সীমান্তে ৪ জনকে পুশইনের চেষ্টা বৃষ্টি মনোমুগ্ধকর খুনি প্রথম কবি দেখা ও কয়েক টুকরো স্মৃতি হজ শেষে দেশে ফিরেছেন ৬০ হাজার ৫৮৮ হাজি, মৃত্যু ৫৪ ‘দোষ সব আমার, খেলোয়াড়দের ওপর থেকে নজর সরান’: প্যারাগুয়ে কোচ শুক্রবারের নির্ধারিত মার্কিন-ইরান আলোচনা বাতিল : সুইজারল্যান্ড মিথ্যার চোরাস্রোত বয়ে যায় আর্থিক সংকটে ভর্তি অনিশ্চিত, শিক্ষার্থীর পাশে প্রতিমন্ত্রী অনুবাদ হয় না মানুষের স্মৃতির ভেতর অন্ধকারের গান প্রেমের এলিজি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের সুইজারল্যান্ড সফর স্থগিত দুবাইগামী যাত্রীর লাগেজ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা জব্দ রেকর্ড থেকে ৫ কদম দূরে দিবু মার্তিনেস সমাজবোধ ও জীবনবীক্ষা জুহান্নুস: ফিনল্যান্ডের সেই অনন্য উৎসব, যখন পুরো দেশ চলে যায় প্রকৃতির কোলে জামিন পেয়েও নতুন মামলায় আটক সাবেক শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রী হাইতি ম্যাচে পরিবর্তনের আভাস আনচেলত্তির বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য ফুটবল ও লাতিন আমেরিকার কথাসাহিত্য ‘আফ্রিকান ব্রাজিলিয়ান’ মরক্কো ফুটবল শেখাল আসল ব্রাজিলকে: বোমেল

বনের জায়গায় কাসাভা চাষ বন্ধ করুন

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৪, ১০:১০ এএম
বনের জায়গায় কাসাভা চাষ বন্ধ করুন

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নে দেড় হাজার একর সংরক্ষিত বন উজাড় করে কাসাভা চাষ করা হচ্ছে। প্রায় এক যুগ আগে লাগানো গাছগুলো কেটে সাবাড় করে লাগানো হয়েছে কাসাভা। টিলার পর টিলার বন ধ্বংস করে লাগানো হচ্ছে কাসাভা। স্থানীয়দের মতে, কাসাভা চাষ করছেন স্থানীয় ও পাশের উপজেলার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাদের কাছ থেকে পাইকারি দামে কাসাভা নিয়ে যায় প্রাণ গ্রুপ। বিষয়টি স্থানীয় বিট কর্মকর্তা জানলেও এ থেকে প্রতিকার হয়নি। বন বিভাগ বন উজাড়ের দায় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করলেও খবরের কাগজ প্রতিনিধিদের সরেজমিন পরিদর্শনে জানা গেছে পাহাড়ি, বাঙালি এবং বন বিভাগের লোকজন মিলেমিশে বন উজাড় করছেন।

তথ্য বলছে, চট্টগ্রামের নারায়ণ ঘাট রেঞ্জের আওতায় উত্তর কাঞ্চননগর মৌজায় বন বিভাগের ৩ হাজার ৭৩৭ একর সংরক্ষিত বন রয়েছে। এর মধ্যে দেড় হাজার একরের বেশি টিলায় কাসাভা চাষ হয়েছে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে প্রায় শত বছরের পুরোনো শত শত একর সেগুন, আকাশমণি, গামারি, বহেড়ার বাগান উজাড় করে সেখানে ব্যাপকভাবে কাসাভা চাষ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কাসাভাচাষিরা বন বিভাগ থেকে একর হিসেবে ভাড়া নিয়ে কাসাভা চাষ করেছেন। প্রাণ গ্রুপ থেকে তারা চাষের খরচ পান। ফসল তোলার পর কেজি ১০ টাকা করে প্রাণ গ্রুপ কিনে নিয়ে যায়। যেহেতু বিক্রির দুশ্চিন্তা নেই, সে জন্য কাসাভা চাষের দিকেই চাষিরা ঝুঁকছেন। এমনকি কাসাভা চাষে সরকারি কর্মকর্তাদেরও জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

কাসাভা চাষে যেমনি ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য, তেমনি মরছে গবাদিপশুও। আবাস নষ্ট হওয়ায় বন্য প্রাণী খুবই ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেম বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। প্রাণ-প্রকৃতি সবই বিলুপ্ত। চারদিকে এখন শুধুই কাসাভা আর কাসাভা। এখন যে জাতের কাসাভা আবাদ হচ্ছে এটা যদি কোনো পশুপাখি খেয়ে থাকে, তা শরীরের জন্য ক্ষতিকারক। এতে শুকিয়ে যাচ্ছে হালদার পানির উৎস। বন উজাড় করে মরূকরণের কারণে প্রাকৃতিক পানির উৎসগুলোও শুকিয়ে যাচ্ছে। 

ভরাট হয়ে যাচ্ছে খাল, ঝিরি, ছড়া ও ঝরনা। চাষাবাদে বিঘ্ন ঘটছে। প্রাকৃতিক মাছ প্রজননক্ষেত্র হালদার শাখা শুকিয়ে পরিণত হয়েছে গোচারণ ভূমিতে। হালদা গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, বনের সঙ্গে পানির সম্পর্ক আছে। যে পাহাড়ে যত বেশি গাছ থাকে, সেই পাহাড় তত বেশি পানি সংরক্ষণ বা ধারণ করবে। তা ছোট ঝরনার মাধ্যমে খালে এসে পড়ে। বন ধ্বংসের কারণে ঝিরি, ঝরনা, খাল শুকিয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। দেশের রুই-জাতীয় মাছের একমাত্র প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীতে পানি নেই। কারণ পানির উৎসগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। 

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওলজি বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, কাসাভা একদিকে ওষুধ, আবার কিছু ক্ষেত্রে এর পাতা গবাদিপশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এমনকি বেশি খেলে পশুর মৃত্যুও হতে পারে। তবে আসল কারণ বের করার জন্য কাসাভা এবং ওই গাছের পাতা পরীক্ষা করা জরুরি।

সংরক্ষিত বন উজাড় করে কাসাভা চাষ কোনোভাবেই কাম্য নয়। জীববৈচিত্র্য এবং ইকোসিস্টেম রক্ষায় বন বড় ভূমিকা পালন করে। কিন্তু ইদানীং পাহাড়ি বন উজাড় করে একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পাহাড় ধ্বংসলীলায় মেতেছে। বন বিভাগও নীরব দর্শকের ভূমিকায়। আঙুল তুলছে একে অপরের দিকে। কর্মকর্তারা বলছেন, তারা পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছে অসহায়। তা হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কী ভূমিকা রেখেছে! আশা করছি, অচিরেই পাহাড় এবং বনখেকো এই অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। সরকার এসব অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বন, পাহাড় সুরক্ষিত হোক।  

শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া বিধিনিষেধ আরোপ সময়ের দাবি

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম
বিধিনিষেধ আরোপ সময়ের দাবি

সমস্যাটি আকস্মিকভাবে নয়, তৈরি হয়েছে দীর্ঘ সময়ের ধারাবাহিকতায়। স্মার্টফোনের আসক্তিতে আমাদের শিশু-কিশোররা ডুবে আছে। দিনের অধিকাংশ সময় তারা ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের ভার্চুয়াল জগতে আচ্ছন্ন থাকছে। এ জগৎ মূলত অলীক, বাস্তবের নয়; এমনকি সৃজনী-কল্পনার জগৎও নয়। বর্তমান প্রজন্ম এভাবে বন্দি থাকায় খেলাধুলা আর বইয়ের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। অনেকেই ভুগছে মানসিক সংকটসহ নানা ধরনের অপরাধে। দেখা দিচ্ছে শারীরিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকট। একটা পুরো প্রজন্ম এখন প্রযুক্তির সুফল পাওয়ার চেয়ে প্রযুক্তির আগ্রাসনে বিপন্ন। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়ে এই সংকট এতটাই বিস্তৃতি পেয়েছে যে বিশ্ব গণমাধ্যমে এর নিয়ন্ত্রণের খবর বেরোচ্ছে। উন্নত দেশগুলোই এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসছে সবার আগে। ১৬ বছরের নিচের শিশুদের জন্য নিষিদ্ধ করছে স্মার্টফোনের ব্যবহার।

উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের মতো পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর পার্থক্য অনেক। মূল পার্থক্য শিশুদের সুরক্ষায় তাদের নানা ব্যবস্থা রয়েছে। আইনকানুনের পরিবর্তে পারিবারিক সামাজিক রাষ্ট্রিক পরিবেশ এমন যে শিশুরা সেখানে নিরাপদে বেড়ে ওঠে। এর পরও তারা স্মার্টফোনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। সেই তুলনায় আমাদের দেশে শিশু নিরাপত্তার বিষয়টি বেশ নাজুক। সামাজিক ও পরিবেশগত নিরাপত্তার অভাবে শিশুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। এ রকম পরিস্থিতিতে স্মার্টফোনের ব্যবহার তাদের আরও অনিরাপদ করে তুলছে। তারা মানসিক ও শারীরিক সমস্যায় ভুগছে। এ প্রেক্ষাপটে দেশে এখন শিশু-কিশোরদের জন্য স্মার্টফোনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা জরুরি। শিশু-কিশোরদের নানামুখী সংকট যেভাবে বাড়ছে, তাতে এর কোনো বিকল্প নেই।

স্মার্টফোন হাতে পেলে শিশু-কিশোররা প্রথমেই সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি আসক্ত হয়। ফেসবুক, ইনস্ট্রাগ্রাম, টিকটক ও ইউটিউবে সময় কাটায়। স্কুলের সময়টা যেভাবেই হোক, বাকি সময় এসবে বুঁদ হয়ে থাকে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীকে তাৎক্ষণিক তৃপ্তি দেয়। প্রায় সম্পূর্ণ মনোযোগ স্মার্টফোনে নিবদ্ধ থাকে। খেলাধুলা না করায় শরীর স্থূল হয়ে পড়ে, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা দেখা দেয়, পড়াশোনায় ঘাটতি পড়ে, সৃজনীক্ষমতা লুপ্ত হতে থাকে।

বিশ্বজুড়ে সাইবার বুলিং ও ডিজিটাল হয়রানি একধরনের স্বাভাবিক প্রবণতা হয়ে উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের যৌন হয়রানিও ঘটে। কিছুদিন আগে এই অপরাধে বাংলাদেশের একজনকে মালয়েশিয়া থেকে আটক করে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ। কোমলমতি ছেলেমেয়েদের কেউ কেউ সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষ করে ফেসবুক-মেসেঞ্জারের মাধ্যমে কাছাকাছি চলে আসায় হার্দ্রিক টানাপোড়েনেরও শিকার হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের মতো ঘটনা ঘটছে। এতে বাড়ছে মানসিক সংকট, ব্যাঘাত ঘটছে পড়াশোনায়। পরিবারের সদস্যরা পরস্পরকে যদি বেশি সময় দেয়, তাহলে পারিবারিক বন্ধন স্বাভাবিক থাকে। ভার্চুয়াল জগতে শিশু-কিশোররা বেশি সময় কাটানোর জন্য এই বন্ধনও এখন অনেকটাই শিথিল, বিশেষ করে নগরজীবনে। একসময় রূপকথার বই বা অন্য সৃজনশীল বই পড়ে শিশুরা বেড়ে উঠত। স্মার্টফোনের কারণে এই অভ্যাস এখন উঠেই গেছে। বই পড়ার পরিবর্তে ফেসবুকে সময় কাটাতে ভালোবাসে শিশুরা। অপরাধ জগতেও তাদের প্রবেশ ঘটছে সহজেই। কিশোর গ্যাংয়ের উৎপত্তির উৎস এই স্মার্টফোন।

সোশ্যাল মিডিয়ার এই আসক্তি এখন বিশ্বজনীন সমস্যা। শিশু সুরক্ষায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সরকার কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে। এই নিষেধাজ্ঞা অনুসারে ১৬ বছরের কম বয়সীরা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে পারবে না। ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, নরওয়ে, ইংল্যান্ড সোশ্যাল মিডিয়ায় শিশুদের প্রবেশাধিকার প্রতিরোধ করার জন্য নিজস্ব পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে। আমাদের দেশেও এখন এই বয়সী শিশুদের জন্য এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করার সময় এসেছে। খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই অভিমতই দিয়েছেন দেশের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী নিষিদ্ধের নির্দেশনা চেয়ে রিটও করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের এর হাত থেকে রক্ষা করা না গেলে একটা প্রজন্ম ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। নিষিদ্ধের বিষয়টি এখনই ভেবে দেখা প্রয়োজন। তবে এককভাবে নয়, এ জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। আমরা মনে করি, সরকারের একার পক্ষে এটা নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়। অভিভাবক, শিক্ষক, পুলিশ, সমাজপতিদের সম্মতি ও গণমাধ্যমের প্রচারের সম্মিলিত উদ্যোগেই এটা নিষিদ্ধ করা সম্ভব। সরকার এ জন্য প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে পারে। অন্য দেশগুলো যেহেতু অনেক ভেবেচিন্তে, গবেষণা করে নিষিদ্ধ করেছে, আমাদেরও শিশু-কিশোরদের জন্য নিষিদ্ধ করা জরুরি।

ঢাকা-দিল্লি আবার উত্তেজনা স্বীকৃত কূটনৈতিক পথে সমাধান খুঁজতে হবে

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ১২:৫০ পিএম
স্বীকৃত কূটনৈতিক পথে সমাধান খুঁজতে হবে

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে আবার একধরনের উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্রাটেজিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে ভারতের দিল্লিতে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। পরে তিনি প্রবেশের অনুমতি পেলেও দিল্লি বিমানবন্দর থেকে ঢাকায় ফিরে এসেছেন। তার ফিরে আসার এ ঘটনায় বাংলাদেশে তুমুল আলোচনার জন্ম হয়েছে। 
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এ ঘটনাকে দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পাওয়ান বাঢ়েকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছে। ঘটনা প্রসঙ্গে গতকাল, অর্থাৎ ঘটনার এক দিন পর জাহেদ উর রহমান সাংবাদিকদের কাছে তার ফিরে আসাকে ‘ইন্সট্যান্ট’ বা তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ বলে উল্লেখ করেছেন।

খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জাহেদ উর রহমানের দিল্লি যাওয়ার বিষয়টি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নোট ভার্বাল দিয়ে জানানো হয়েছিল। দিল্লি বিমানবন্দরে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহও উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার পরিচয় ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের অবহিত করেন। কিন্তু হাসিনা সরকারের পতনের আগে তার ইউটিউব চ্যানেল ভারতে নিষিদ্ধ করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে ভারতবিরোধী বক্তব্যের কারণে তার পাসপোর্ট ব্ল্যাকলিস্টেড করে ভারত। তিনি কূটনৈতিক পাসপোর্ট না নিয়ে দিল্লি গিয়েছিলেন। কালো তালিকাভুক্ত করার কারণে তাকে দিল্লি বিমানবন্দরে বসিয়ে রাখা হয়। পরে খোঁজখবর নিয়ে দিল্লি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেয়। কিন্তু তিনি পাসপোর্ট ফেরত নিয়ে শ্রীলঙ্কার কলম্বো হয়ে দেশে ফিরে আসেন।

এ ঘটনা প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ খবরের কাগজকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা নিয়ে দিল্লিতে কেন কূটনৈতিক পাসপোর্ট না নিয়ে গেলেন। যদি আমরা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাই, তাহলে এ নিয়ে উত্তেজনা না বাড়িয়ে কী কারণে এটা ঘটেছে, সেটা কথা বলে মিটিয়ে নেওয়া ভালো। দেশের স্বার্থকে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া উচিত।
বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত নিঃসন্দেহে। প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার উপদেষ্টার ভারতে ঢুকতে না পারাটা উভয় দেশেরই কূটনৈতিক ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই নয়। বিগত অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। বাংলাদেশের নির্বাচিত নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্ক উন্নয়নের আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। ভারতের দিক থেকেও উদ্যোগ নিতে দেখা গেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিরলা শোক জানাতে ঢাকা এসেছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানও কয়েকবার দিল্লি গেছেন। কূটনৈতিক পর্যায়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টাও রয়েছে। কিন্তু এ ঘটনাটি এমন একসময়ে ঘটল, যখন ভারত থেকে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে কথিত বাংলাদেশিদের পুশইনের খবর আসছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী ও বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে এ সমস্যা নিয়ে বৈঠকও হয়েছে, কিন্তু উত্তেজনা প্রশমন ঘটেনি।

পরিস্থিতি যা-ই হোক, অনাকাঙ্ক্ষিত এসব ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে না ঘটে, সেদিকে আমাদের নজর দিতে হবে। ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কে যেমন সংবেদনশীল, তেমনি আমাদেরও কূটনৈতিক সমাধান খুঁজতে হবে। এর প্রধান উপায় হচ্ছে আলাপ-আলোচনা করা। সামনে দুই দেশের মধ্যকার আরও কিছু সমস্যার সমাধান করার বিষয় রয়েছে। সেসব সমস্যা যাতে সমাধান করা যায়, সে ব্যাপারে উভয় দেশকেই সতর্ক থেকে এগিয়ে আসতে হবে। উত্তেজনা না বাড়িয়ে পরস্পরের স্বার্থে সমমর্যাদা নিয়ে সমাধানের পথ বের করতে হবে। ভারতীয়দের যেমন অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হওয়া ঠিক হবে না, তেমনি আমাদেরও যৌক্তিক ও স্বীকৃত কূটনৈতিক পথে অগ্রসর হতে হবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের অনিয়ম অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ১২:১৬ পিএম
অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল এখন যেন অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দু। কতিপয় কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের যোগসাজশে সিআরবির চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। এ কারণে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সেখানে কাগজে-কলমে জনবল শতভাগ পূর্ণ থাকলেও বাস্তবে মাঠপর্যায়ে এর সঙ্গে কোনো মিল নেই। নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকির অভাবে অরক্ষিত থেকে যাচ্ছে রেলপথ। এতে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের রেল দুর্ঘটনা। সিআরবির বিভিন্ন নথি বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ওয়েম্যানরাই রেলপথের মূল তদারককারী। তাদের অনুপস্থিতিতে লাইনের নাট-বল্টু ঢিলা হওয়া বা ফাটল শনাক্ত না হওয়ায় লাইনচ্যুত ও বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের রেললাইনে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ওয়েম্যানদের একটি বড় অংশ কর্মস্থলে না গিয়ে নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। লাইনে কঠোর শ্রম দেওয়ার কথা থাকলেও অনেকে বিভিন্ন নেতার দপ্তরে কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে মাস শেষে বেতন তুলছেন। আর মাসোহারা দিয়ে বছরের পর বছর চাকরি ধরে রেখেছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কিছু অসাধু কর্মচারী শ্রমিক দলের নাম ভাঙিয়ে কিংবা তথাকথিত সংস্কারপন্থি গ্রুপের লেবাস ধরে সুবিধা নিচ্ছেন। এতে রেলওয়ে বড় ধরনের লোকসান ও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলী-১-এর অধীনে গ্যাং নম্বর ১৪-তে মাত্র তিন থেকে চারজন কর্মী কাজ করছেন। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের বাংলাবাজার এলাকায় এসআরভি রেলস্টেশনে সিজিপিওয়াই গ্যাংয়ের অধীনে ৯ জন রেলপথকর্মী নিয়োজিত থাকার কথা। কিন্তু সেখানে একজন ওয়েম্যান কাজ করছেন। একই চিত্র দেখা গেছে এসএসএই (ওয়ে) চট্টগ্রাম ও এসএসএই (ওয়ে)-ষোলশহরসহ প্রতিটি দপ্তরে। প্রশাসনের নাকের ডগায় এই নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে রেলপথ। এর আগে একবার ওয়েম্যানদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরার আদেশ জারি করা হয়েছিল, কিন্তু সে আদেশ মানেননি রেলের কিছু অসাধু কর্মচারী। এতে যারা রেলপথে নিয়মিত কাজ করছেন, তাদের ওপর বাড়তি কাজের চাপ পড়ছে।

সাধারণ কর্মচারীদের মতে, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারাই মূলত এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় এসএসএই (সিনিয়র সাব-আ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার) বা এইএন (আ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার) পর্যায়ের কর্মকর্তারা যদি কঠোরভাবে তদারকি না করেন, তাহলে প্রধান প্রকৌশলীর একক প্রচেষ্টায় দীর্ঘদিনের ফাঁকিবাজির সংস্কৃতি বন্ধ করা সম্ভব নয়।

অবস্থাদৃষ্টে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের অনিয়ম দেখার যেন কেউ নেই। রেলওয়ের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন তথ্য দিতেও অপারগ অনেক কর্মকর্তা। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্বে অবহেলা করলেও তারা নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে তাদের চাকরি ঠিক রাখেন। এ কারণে তাদের চাকরি হারানোর কোনো ঝুঁকি থাকে না। এ পরিস্থিতিতে অরক্ষিত রেলপথকে সুরক্ষিত করতে এবং অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা যাতে তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করেন, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আমরা চাই, দুর্ঘটনা নয়, অরক্ষিত রেলপথ সুরক্ষিত হোক। নিরাপদ হোক যাত্রীদের রেল ভ্রমণ। 

মূল্যস্ফীতি নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০১:১১ পিএম
বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে

জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের জন্য বাজেট উত্থাপিত হয়েছে। এবার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার আগের অর্থবছরের তুলনায় বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। আর পয়েন্ট টু পয়েন্ট হিসাবে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ, যা এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতির ইঙ্গিত দেয়। প্রস্তাবিত বাজেটে গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। মূল্যস্ফীতি কমানো নিয়ে অর্থমন্ত্রী বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তিনি বলেছেন, বাজার বা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সরকারি লোক দিয়ে পিটিয়ে করার বিষয় না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে সঠিক নীতি, ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ব্যবসায় খরচ কমাতে হবে। এতে একদিকে কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে মানুষের আয় বাড়বে। বাজারে পণ্য সরবরাহ বাড়বে। আর এভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ এবারের বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমানোর ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অপরদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)ও বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলন করেছে। টানা চার বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে নতুন অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখার যে লক্ষ্য ঠিক রেখেছে বিএনপি সরকার, তা পূরণে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে সিপিডি।

সিপিডির মতে, দেশের মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহজনিত; যা শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ব্যয়ের মাধ্যমে যদি উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ে, তাহলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা টেকসইভাবে উন্নত হবে। অন্যথায় অতিরিক্ত ব্যয় কেবল মূল্যস্ফীতির চাপই বাড়াতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে রাজস্ব, মুদ্রা ও সরবরাহব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। এর জন্য সাশ্রয়ী দামে পর্যাপ্ত খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও কিছু সময় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখতে হতে পারে। একইভাবে রাজস্বনীতি এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে যেন সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে দুর্বল না করে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ, সংস্কারমুখী ও ব্যবসাবান্ধব বলে মনে করে। তাদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানিসংকট, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিকে পুনর্জীবিত করতে সরকারের গৃহীত সংস্কারমুখী উদ্যোগ সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। 
সরকারি নীতিনির্ধারকদের মতে, আগামী দশকের অর্থনীতি সামনে রেখে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ এবং ‘ডিজিটাল ইকোনমি’ গড়ে তোলাই এ বাজেটের অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্য। বিএনপির নেতারা মনে করেন, বিগত ১৭ বছরে অর্থনীতির যে স্থবিরতা ও আস্থার  সংকট তৈরি হয়েছিল, এই বাজেট তা কাটিয়ে ওঠার একটি কাঠামোগত রূপরেখা। বর্তমান সরকার এই বাজেটের মাধ্যমে তিনটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে–জনগণের কাছে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার, বিনিয়োগকারীদের কাছে স্থিতিশীলতার বার্তা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের কাছে একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপরেখা উপস্থাপন। এদিকে মূল্যস্ফীতি সত্ত্বেও করমুক্ত আয়সীমা অপরিবর্তিত রাখা ও সর্বোচ্চ আয়কর ৩৫ শতাংশ নির্ধারণ হতাশাজনক বলে কেউ কেউ মনে করেন।

দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারসংকট, ব্যাংকিং খাতে দুর্বলতা, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না। এ অবস্থায় সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বেশ কিছু উদ্যোগের কথা বলেছে। পাশাপাশি বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজও দিয়েছে সরকার। সরকার প্রশাসনিক বাধা কমিয়ে বিনিয়োগের স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে অর্থনীতির সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। 
দেশে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং করব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। গত শনিবার ‘প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭-এর ওপর চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের ভাবনা শীর্ষক সম্মেলনে বলা হয়েছে, খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে দশমিক ২ শতাংশ হারে কর কেটে রাখা হলে তা মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে।

বাজেটোত্তর পর্যালোচনায় আমরা দেখেছি, বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমাতে নানামুখী পদক্ষেপের কথা বলেছেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মাথায় রেখে সরকারও নিত্যপণ্যের দাম কমাতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে করছাড়ই যথেষ্ট নয়, সেই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ শৃঙ্খলও সঠিকভাবে কার্যকর করতে হবে। অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করেও সরকারকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। আশা করছি, সরকার মূল্যস্ফীতি কমাতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করতে সক্ষম হবে।

নিঃসঙ্গ মৃত্যু বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারই হোক নিশ্চিত আশ্রয়

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম
বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারই হোক নিশ্চিত আশ্রয়

সম্প্রতি দেশে বেশ কিছু মৃত্যু নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গণমাধ্যমে যে বিষয়টি আলোড়ন সৃষ্টি করে তা হলো মিরপুরের ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের মৃত্যু। তার সন্তানরা উচ্চশিক্ষিত হলেও তিনি জীবনের শেষ মুহূর্তে ছিলেন নিঃসঙ্গ। তার মৃত্যুর কয়েক দিন পরই একই এলাকার ৫৫ বছর বয়সী আফরোজা নামের আরেক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমানও জীবনের শেষ মুহূর্তে ছিলেন নিঃসঙ্গ। মৃত্যুর পর কয়েক দিন ধরে বন্ধ ঘরে পড়ে থাকা কোনো বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার মরদেহ শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়; এটি সমাজের মূল্যবোধ ও মানবিকতার জন্য এক গভীর ক্ষতচিহ্ন। এ ঘটনাগুলো শুধু কয়েকজন মানুষের মৃত্যুর গল্প নয়। এগুলো এমন এক সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে, জীবনযাত্রার মান বাড়ছে, কিন্তু পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। 

দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৪ লাখেরও বেশি, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক দশকে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সাড়ে তিন থেকে চার কোটিরও বেশি হবে। তখন দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ থেকে ২২ শতাংশই হবেন প্রবীণ। আমাদের দেশে অনেক বৃদ্ধ বাবা-মা একাকী জীবন কাটান। অনেক বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সন্তান বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু অনেকেই আছেন, যারা বাবা-মায়ের দায়িত্বে অবহেলা করেন। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের খোঁজ না রাখা যতটা অমানবিক ততটা সামাজিক অন্যায়ও। বিশ্বায়নের প্রভাবে নগরজীবনের যেমন ব্যস্ততা বাড়ছে, সেই সঙ্গে দায়িত্ববোধের ঘাটতি, সম্পর্কের দূরত্বও সামনে আসছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃদ্ধ বয়সে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কেবল অর্থ নয়, দরকার মানসিক নিরাপত্তাও।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আনজুমান আরা বলেন, আধুনিক সমাজে বৃদ্ধাশ্রমের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। জাপান, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশে ওল্ড হোম বা বৃদ্ধাশ্রম খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যবস্থা। আমাদের দেশেও এখন অনেক আধুনিক বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠছে। সন্তানরা কর্মজীবন বা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতেই পারেন, সেটা অপরাধ নয়। তবে বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা চাকরিজীবনের শুরু থেকেই ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করতে পারেন। পেনশন বা আয়ের একটি অংশ প্রবীণ বয়সে নিরাপদ আবাসনের জন্য সঞ্চয় করা যেতে পারে। 

পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, আগামী বাংলাদেশ হবে বয়স্ক মানুষের বাংলাদেশ। সে কারণে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ আইন নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাবা-মায়ের ভরণপোষণ আইন-২০১৩ অনুযায়ী সক্ষম সন্তানদের বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতে হবে। দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে শাস্তির বিধানও রয়েছে। আমাদের দেশের বাবা-মায়েরা চান না সন্তানরা শাস্তি পাক। তারা ভালোবাসার এক নিরাপদ আশ্রয় খোঁজেন। আমাদের বাব-মায়েরা নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে ডুবে না যাক, সন্তানদের কাছেই হোক তাদের শেষ আশ্রয়। আমরা সবাই চাই এমন এক মানবিক ও নিরাপদ সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যেখানে বৃদ্ধাশ্রম নয়, প্রত্যেক বাবা-মা তার সন্তানের কাছে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাবেন।