ঈদের আনন্দযাত্রায় সড়ক, লঞ্চ, ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণহানি থেমে নেই। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। খবরের কাগজের প্রতিবেদকদের পাঠানো তথ্য মতে, দেখা যাচ্ছে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন জেলায় দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এতে বহু পরিবারের কাছে ঈদের আনন্দ ফিকে হয়েছে অশ্রুভরা বিষাদে। সর্বশেষ গত বুধবার রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পন্টুন থেকে একটি বাস পদ্মা নদীতে পড়ে তলিয়ে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। যা খুবই বেদনাদায়ক। সূত্র মতে, কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস বিকেল ৫টার দিকে দৌলতদিয়া তিন নম্বর ফেরিঘাটের পন্টুনে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। দুর্ঘটনাস্থলে নদীর গভীরতা অনেক বেশি হওয়ায় উদ্ধারকাজেও বেগ পেতে হয়েছে। বিশেষ করে ফেরিতে ওঠা-নামা করার সময় গাড়িতে যাত্রী বসে থাকে এটা কোনোভাবেই ঠিক নয়। তাই যাত্রীদের আগে থেকে এ ব্যাপারে সতর্ক করতে হবে। যাত্রীদের ফেরিতে ওঠা-নামার সময় নিয়ম মানতে বাধ্য করতে হবে। যাত্রীরা সতর্ক থাকলে এ ধরনের দুর্ঘটনা থেকে বা অধিক প্রাণহানি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে। এ ছাড়া চালকদের অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে বাড়তি চাপ, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, দীর্ঘ যাত্রা, চালকের ক্লান্তি, ফিটনেস ছাড়া গাড়ি, ভাঙাচোরা সড়ক ও দুর্বল তদারকির কারণে প্রতিদিন সড়কে ঘটছে দুর্ঘটনা। পুলিশের গবেষণা বলছে, চালকের অসচেতনতাই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। বিশ্লেষকরা বলছেন, সড়ক ব্যবস্থাপনা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ না থাকায় এ ধরনের দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। ঈদের আগে ও পরে কয়েকদিন দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি ঘটে থাকে। এ সময় গাড়ির চালকরা সড়কে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অনেক সময় চালকের ক্লান্তির কারণে গাড়ির হেলপার দিয়ে যান চালানোর ঘটনাও ঘটে। এতে হেলপার বেপরোয়া গতিতে পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালায়। যার ফলে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। ফাঁকা রাস্তায় লাগামহীন গতিতে গাড়ি চালানো ও উঠতি বয়সী তরুণদের মোটরসাইকেল রেসের কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেকটা শৈথিল্যের কারণও রয়েছে।
শুধু ঈদকে কেন্দ্র করেই যে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে তা নয় এ দেশে প্রতিনিয়ত সড়কে দায়িত্বে অবহেলার কারণে প্রতিদিন মানুষ মারা যায়। কখনো কখনো অঙ্গহানি হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করতে হয় বহু মানুষকে। বাংলাদেশ পুলিশের গবেষণা তথ্য মতে, সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৪২ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। আর ২৯ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে সড়ক দুর্বল থাকার কারণে। সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এর ১০৫ ধারায় বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত গাড়ি চালানোয় মৃত্যু বা গুরুতর আহত হলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান থাকলেও এ আইনের কার্যকারিতা তেমনটা লক্ষ্য করা যায় না। ফলে অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যান। তাই সর্বমহলে এখন একই দাবি সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের।
প্রতিদিনই দেশে দুর্ঘটনা ঘটছে কিন্তু সব খবর গণমাধ্যমে আসে না। যে কারণে সঠিক তথ্য উপাত্ত বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে প্রতিবন্ধক বা গেটকিপার না থাকায় ট্রেন অন্যান্য যানের সঙ্গে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যাও বাড়ছে। এখানে কর্তৃপক্ষের চরম দায়িত্বহীনতার বিষয় জড়িয়ে রয়েছে। এ ছাড়া যানবাহন চালক ও পথচারীদের সতর্ক হয়ে রেললাইন পার হতে হবে। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে ট্রেনে আগুন লেগে দুটি বগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ বিষয়টি তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
গত কয়েকদিন আগে আমরা দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি, দুই লঞ্চের মাঝে পড়ে পিষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে একজনকে। এভাবে স্বজন হারানোর দুর্বিষহ বেদনা নিয়ে কত পরিবারকে যে বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস বয়ে নিয়ে বেড়াতে হচ্ছে তার খবর কে রাখে! দেশে দুর্ঘটনা হয় তদন্ত কমিটি হয় কিন্তু দুর্ঘটনার আসল কারণই আলোর মুখ দেখে না। যে কারণে দুর্ঘটনা রোধ করার উপায়ও সামনে আসে না। এতে করে অপরাধীরা সড়কে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তাই সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যানবাহন চালক, হেলপার, সুপারভাইজার, পথচারী সবাইকে সড়কের নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ না হোক, এটাই প্রত্যাশা।