ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে ইরানে ব্যাপক হামলা করবেন। এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধবিরতির জন্য অনুরোধ করেছেন বলে ট্রাম্প যা জানিয়েছেন, তা অস্বীকার করেছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তেহরান কোনো সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি নয়। তাদের মূল লক্ষ্য হলো এ যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি ঘটানো। তেহরান মনে করে, কেবল যুদ্ধবিরতি হলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো সময় পুনরায় হামলা চালানোর সুযোগ পাবে। তারা সাময়িক সমাধানের বদলে যুদ্ধের একটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী সমাপ্তি নিশ্চিত করতে আগ্রহী। ইরান সরকার এ বার্তাই দিচ্ছে, তারা দীর্ঘ লড়াইয়ের ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করবে না, তবে লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত পিছু হটবে না।
ইরান যুদ্ধ বন্ধের চুক্তিতে রাজি না হলে বিদ্যুৎ স্থাপনা, তেলকূপ ও খার্গ দ্বীপে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। অর্থাৎ দেশটির জ্বালানি তেলসম্পদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিতে চান তিনি। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা কূটনৈতিকভাবে সমাধানের কথা ভাবছেন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের আরও কতগুলো লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাবেন, সে তালিকা সাংবাদিকদের বলছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেট গত সোমবার দেশটির ইতিহাসের বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় বাজেট পাস করেছে। এতে তাদের প্রতিরক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট ধরা হয়েছে। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা ইসরায়েলের এ বাজেট অনুমোদনকে কয়েকটি দেশ লক্ষ্য করে সর্বাত্মক সামরিক আগ্রাসন দীর্ঘায়িত করার প্রস্তুতি হিসেবে দেখছেন। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত হাজার হাজার স্থল সেনা মোতায়েন করেছে ওয়াশিংটন। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেক বিশ্লেষক।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা গত রবিবার সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন। মার্কিন গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, রাশিয়া তেহরানকে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের যুদ্ধে রাশিয়ার সরাসরি সহায়তা সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। পরোক্ষভাবে ট্রাম্প পুতিনের বিরুদ্ধেও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ ধরনের আগ্রাসী নীতি মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
নিরাপত্তাবিষয়ক বিশ্লেষক মিকি কে বিবিসিকে বলেন, ইরানের যুদ্ধ পরিচালনায় মূল ভূমিকা রাখছে দেশটির বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। এখন খার্গ দ্বীপ দখল করে নিলে বাহিনীর আয়ের প্রধান উৎস বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে যুদ্ধ পরিচালনায় আইআরজিসির সক্ষমতাও কমতে পারে। যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যে সংঘাত কমানোর পথ খুঁজতে পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিসর ও তুরস্কের শীর্ষ কূটনীতিকরা ইসলামাবাদে বৈঠক করেছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বরাতে এদিকে নানা কড়াকড়ি সত্ত্বেও ইরান তার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুত বাড়িয়ে চলেছে। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা তাদের উৎপাদনব্যবস্থাকে পশ্চিমা চাপ থেকে সুরক্ষিত রেখেছে। অক্ষশক্তির এই নেটওয়ার্ক মোকাবিলা করতে না পারলে ইরান তার সামরিক সক্ষমতা আরও বাড়াবে।
বর্তমান যুদ্ধ এবং ভবিষ্যতের সংঘাতগুলোতে এ অক্ষশক্তি পশ্চিমা বিশ্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। মধ্যপ্রাচ্যে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে খরচ বাড়ছে মার্কিন প্রশাসনের। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে হোয়াইট হাউস। তাই এ ব্যয় কমানোর উপায় হিসেবে হোয়াইট হাউস প্রেস সচিব কেরোলিন লেভিট ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরব দেশগুলোর কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা চাইতে পারেন। সম্প্রতি ট্রাম্প পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে ১৫ দফা প্রস্তাব পাঠান। ইরান সে প্রস্তাব পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে এবং তা পর্যালোচনা করছে। তবে ইরানও নিজেদের কিছু শর্ত দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, শর্ত পূরণ না হলে সংঘাত থেকে সরে আসবে না। আলোচনা ভেস্তে গেলে যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমনকি ইরানে পরমাণু হামলার প্রস্তুতি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। অনেকের ধারণা, এ উত্তেজনা ভবিষ্যতে আরও বড় সংঘাতের দিকে গড়াতে পারে, যদিও একই সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জার্মানির কঠোর সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি অভিযোগ করেন, এই দেশগুলো সংকটের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেনি এবং ইরানের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেয়নি। বিশেষ করে সামরিক সহায়তা ও কৌশলগত সমর্থনের ক্ষেত্রে তাদের অনীহা ওয়াশিংটনের জন্য হতাশাজনক বলে তিনি মনে করেন।
এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দ্রুত সমাধানের বদলে আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। কারণ সামরিক চাপ, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং জ্বালানি নিরাপত্তা- এ তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে। ফলে যেকোনো ছোট ঘটনা বড় আকার ধারণ করতে পারে। এখন দেখার বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত এ পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করে, নাকি নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করে। এত কিছুর পরও জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। আশা করছি, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধে একটি স্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। ট্রাম্প প্রশাসনের বোধদয় হোক। আমরা রক্তের বদলে রক্ত নয়, শান্তি চাই। বিশ্ববাসীর মানবাধিকার রক্ষা পাক। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দূর হোক, এটাই প্রত্যাশা।