ঢাকা ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
একনেকে ৩৮৯১ কোটি টাকার ১০ প্রকল্প অনুমোদন মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে মেয়ের হাতে মা খুন যেখানে ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই নিয়োগ দিচ্ছে ব্র্যাক ব্যাংক গোপালগঞ্জে ইয়াবা ও মদসহ ২ মাদককারবারি আটক গোপালগঞ্জে ইয়াবা ও ভারতীয় মদসহ দুই মাদককারবারি আটক গোপালগঞ্জে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২ ঘুমধুম সীমান্তে আবারও মাইন বিস্ফোরণ, যুবক নিহত কুমিল্লায় মহাসড়কে পুলিশের গাড়িতে হামলা, ভাঙচুর নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের অসন্তোষ, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আলোচনা নিয়ে নতুন বার্তা রায়পুরে হাসপাতাল ও ওষুধের দোকানের বর্জ্যে দূষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে এলাকাবাসী বেটিং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এইচআইভি চিকিৎসায় বড় সাফল্য ছয় বিষয়ের অনার্স কোর্স কি আসলেই বাতিল হচ্ছে? যা জানালেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গফরগাঁওয়ে কলেজছাত্রকে কুপিয়ে হত্যা সরকার আ.লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধই রাখতে চায়: তথ্য উপদেষ্টা দুইজনের মৃত্যুর পর ডেঙ্গুর টিকা স্থগিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নিয়ে হাইকোর্টের রায় স্থগিত যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নাগরিকত্ব বাতিল অভিযান ট্রাম্প প্রশাসনের লাল বাহাদুর দুধ দিয়ে গোসল করে আর্জেন্টিনা ছেড়ে ব্রাজিল শিবিরে ওজন কমানোর অনুমোদনহীন ওষুধের নতুন ক্রেজ এক লাখ কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনায় সম্মতি রাশিয়ার পাঠকের গল্প : বিষ খেতে গিয়ে প্রতারণার শিকার চায়নিজ জামাই চাকরি দেবে রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে চলছে একনেক সভা বাংলাদেশি ব্যবহারকারীদের জন্য ফ্রি গুগল এআই প্রো নিয়ে এল টেকনো ব্রাজিলিয়ানদের সুখবর দিলেন নেইমার রংপুরে ওয়ার্ডভিত্তিক অপরাধচক্র শনাক্তের নির্দেশ আরপিএমপির
Nagad desktop

হামের উচ্চঝুঁকিতে বাংলাদেশ টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করুন

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৭ এএম
টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করুন

দেশের স্বাস্থ্য খাত এখন উদ্বেগজনক অধ্যায় অতিক্রম করছে। বাংলাদেশ যখন হাম নির্মূলের পথে সাফল্যের ছোঁয়া পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল, তখন হঠাৎ করেই এ বছরের শুরুতে হামের প্রাদুর্ভাবের বিষয়টি সামনে আসে। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে ছড়িয়ে পড়েছে হামের সংক্রমণ। প্রায় সারা দেশে রোগের বিস্তার, বহু শিশুর আক্রান্ত হওয়া, উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু, রোগ প্রতিরোধক্ষমতায় ঘাটতি- এসব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন হামের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিকে জাতীয় পর্যায়ে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে মূল্যায়ন করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। টিকার ঘাটতি ও পুষ্টিহীনতাকে দায়ী করছে এ সংস্থা। গত বৃহস্পতিবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত ১৮ মার্চ বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জেনেভা কার্যালয়কে অবহিত করে ঢাকা কার্যালয়। এরপর এমন তথ্য তারা জানাল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আক্রান্তদের মধ্যে ৯১ শতাংশই ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু। তবে হাসপাতালের তথ্যে দেখা যায়, চিকিৎসাধীনদের ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী। এর মধ্যে একটি বড় অংশ (৩৩ শতাংশ) এমন শিশু, যাদের বয়স ৯ মাসও হয়নি, অর্থাৎ যারা এখনো নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আসার বয়সই অর্জন করেনি। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, যারা মারা যাচ্ছে, তারা প্রধানত টিকা না পাওয়া দুই বছরের কম বয়সী শিশু। এটি প্রমাণ করে যে, শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার একটি বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ একসময় হাম নির্মূলের পথে অনেকটা এগিয়ে গেলেও ২০২৪-২৫ সালে এমআর (হাম-রুবেলা) টিকার জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতি সেই অগ্রযাত্রাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এ ছাড়া ২০২০ সালের পর দেশব্যাপী বড় কোনো সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি না থাকা এবং নিয়মিত টিকাদানে শৈথিল্যের কারণে বিপুলসংখ্যক শিশু সুরক্ষাহীন রয়ে গেছে। হাম কেবল সাধারণ সর্দি-জ্বর নয়, বরং বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ানো ঘাতক ব্যাধি। সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে উচ্চমাত্রার জ্বর, সর্দি-কাশি দেখা দেয়। শরীরে বিশেষ ধরনের ফুসকুড়ি ওঠে। এ রোগ নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ) বা অন্ধত্বের মতো স্থায়ী জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা বা ভিটামিনের ঘাটতি থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি। তাই এ রোগতত্ত্ব ও ঝুঁকি সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করা জরুরি।

গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে মোট ২১৬ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এ ছাড়া সারা দেশে আরও ১ হাজার ৪২১ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাদের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৩২ হাজার ২৮ শিশুর। হাম শনাক্ত হয়েছে ৪ হাজার ৬০৩ শিশুর শরীরে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, সংক্রমণ যে হারে বাড়ছে, তাতে সরকারের উচিত দ্রুত ‘জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি’ ঘোষণা করা এবং টিকাদান কার্যক্রমকে আরও বেগবান করা। কেবল কর্মসূচি চালু করাই যথেষ্ট নয়, বরং প্রতিটি পৌর এলাকায় টিকার কভারেজ অন্তত ৯৫ শতাংশ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের স্ক্রিনিং এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্রুত শনাক্তকরণ প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে দেশে হামের মহামারি পরিস্থিতি চলছে, কিন্তু সরকার বিষয়টি স্বীকার করছে না। টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে, যা শিশু হত্যার শামিল। প্রকৃত পরিস্থিতি জনগণের সামনে তুলে ধরে সরকারকে এ সংকট মোকাবিলায় সব পক্ষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাতে হবে।

হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার পর দুটি বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রথম সভা হয় ১২ এপ্রিল। ওই সভায় হাম বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বিস্তার রোধে কার্যকর যোগাযোগের বিষয় বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরেন। এ ছাড়া টিকা কার্যক্রমকে জোরালো পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখার পরামর্শ দেন তারা। কিন্তু আমরা লক্ষ করছি, হামের এই জরুরি পরিস্থিতিতে সমন্বয়হীনতা চোখে পড়ার মতো। জনস্বাস্থ্যবিদ ছাড়াও সংশ্লিষ্ট অন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও নির্দেশনা কাজে লাগাতে হবে; যাতে শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সহজ হয়। আশা করছি, সরকার হাম পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে টিকা কার্যক্রম জোরদারকরণে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

স্মার্টফোনের পর্দায় জুয়ার আসর বেটিং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০১:১৭ পিএম
বেটিং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান

বর্তমান সময়ের আলোচিত একটি বিষয় হচ্ছে অনলাইন জুয়া। মোবাইল অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে নীরব এই মহামারি। আবালবৃদ্ধবনিতা কেউ রেহাই পাচ্ছে না ভয়ংকর এই থাবা থেকে। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, স্কুলশিক্ষার্থীরা এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। এর ভয়াবহতা এতটাই কঠিন যে কেউ কেউ সর্বস্ব হারিয়ে বেছে নিচ্ছেন আত্মহননের পথ। এসব অনলাইন জুয়ার কারণে আত্মহত্যা, খুন, চুরি, ছিনতাই, পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালালেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন এবং বিকাশ ও নগদে লেনদেন সহজ হওয়ায় সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে ভয়ংকর অনলাইন বেটিং সিন্ডিকেট। অনলাইন জুয়ায় শুধু মানুষ সর্বস্ব হারাচ্ছেই না, এর মাধ্যমে বিকাশ, নগদে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে।
তথ্যমতে, নগদ৮৮, বাবু৮৮, সিভি৬৬৬, সিকে৪৪৪, ক্রিক্রিয়া, লাইনবেটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বেটিং অ্যাপ ব্যবহার করে চলছে জুয়ার আসর। দেশে বিকাশ, নগদ, রকেটের মাধ্যমে সহজে টাকা জমা ও উত্তোলনের সুবিধা থাকায় দ্রুত বাড়ছে এ ধরনের অপরাধ। অনেক তরুণ জুয়ার টাকা জোগাতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। ভুক্তভোগীরা জানান, শুরুতে সামান্য লাভ দেখিয়ে অ্যাপগুলো ব্যবহারকারীদের আসক্ত করে তোলে। এরপর আস্তে আস্তে তাদের নিঃস্ব করতে থাকে। বেশি লোভের ফাঁদে পড়ে মানুষ এ পথে পা বাড়ায়। তখন মানুষ এ থেকে বের হতে চাইলেও আর ফেরার পথ হারিয়ে ফেলে। অধিকাংশ ভুক্তভোগী সামাজিক লজ্জা বা ভয় থেকে অভিযোগ করতে চান না। এর ফলে মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

অভিযোগ উঠেছে, অনলাইন জুয়ার পেছনে রয়েছে শক্তিশালী এজেন্ট সিন্ডিকেট, মাস্টার এজেন্ট, সাব-এজেন্ট ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা। এরা অনলাইন জুয়ার জগতের পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। জানা গেছে, খেলোয়াড় হারলেও তারা কমিশন পেয়ে থাকে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে তারা অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নতুন নতুন সদস্য সংগ্রহ করে থাকে। এসব বিজ্ঞাপনে জনপ্রিয় সেলিব্রেটিদের এআই-নির্মিত ভিডিও ব্যবহার করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, অধিকাংশ বেটিং সার্ভার বিদেশ থেকে নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় মূল হোতাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। সীমান্তবর্তী জেলা ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত অঞ্চলগুলোয় এ ধরনের কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়েছে। ফুটপাতের দোকানি থেকে শুরু করে সিএনজিচালক, কলেজশিক্ষার্থী, নির্মাণশ্রমিক, গৃহপরিচারিকা, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী প্রতিনিয়ত এসব বেটিং অ্যাপে জড়িয়ে পড়ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন অ্যাপের সঙ্গে জড়িয়ে এজেন্টরা হঠাৎ করে কালোটাকার মালিক হয়ে যাচ্ছে। দৃশ্যমান বৈধ কোনো আয় না থাকলেও দেখা যাচ্ছে হঠাৎ করে বিলাসবহুল গাড়ি-বাড়ির মালিক হয়ে যাচ্ছে কেউ কেউ। সংশ্লিষ্টরা জানান, ভয়ংকর এই জুয়ার নেটওয়ার্কের বড় শক্তি হলো সহজ প্রযুক্তি ও মোবাইল ব্যাংকিং। জানা গেছে, অনেক গ্রাহক দিনে কয়েকবার বহু অঙ্কের টাকা ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট করছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এটি অনলাইন জুয়ার অংশ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের ধরলেও কিছুদিন পর জামিন নিয়ে বের হয়ে দেশের বাইরে চলে যায়। অপরাধীরা বিদেশে বসে এ ধরনের অপরাধে সক্রিয় থাকে। পুলিশ প্রশাসনও বলছে, মূল হোতারা বিদেশে থাকায় তাদের জন্য তদন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে। এ ছাড়া টাকার প্রবাহ যেখানে বেশি সেখানেই এ ধরনের জুয়ার কার্যক্রম বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাই এ ধরনের জুয়া, হুন্ডি, অর্থ পাচার ঠেকাতে ডিজিটাল নজরদারি বাড়াতে হবে। সন্দেহজনক লেনদেন দেখা গেলে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে রিপোর্ট করতে হবে। অনলাইন জুয়া সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। এ জন্য সরকারকে একটি সমন্বিত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও প্রযুক্তিগত নজরদারি বাড়াতে সরকারকে কাজ করতে হবে।

শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডে ফাঁসির রায় বিচারিক প্রক্রিয়ার এটি এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৯:০৭ এএম
বিচারিক প্রক্রিয়ার এটি এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় করা মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে গতকাল। বহুল আলোচিত এই রায় ঘোষণার মাধ্যমে দেশে বিচারিক প্রক্রিয়ার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। দেশব্যাপী ব্যাপক জনরোষ এবং সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ন্যায়বিচারের আশ্বাসের পর গতকাল রবিবার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুক সালেকিন বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটে এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে তিনি বলেন, শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মামলা কেবল একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়; এটি আমাদের সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা। একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগ দায়ের এ মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ। 

এ রায়ের মধ্য দিয়ে মাত্র ১৯ দিনে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় বিচারের নজির স্থাপিত হলো। বিচারক দণ্ডের পাশাপাশি আসামি সোহেলকে ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়ার আদেশ দেন। অপরদিকে আসামি স্বপ্নাকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন। অর্থদণ্ড ভিকটিম রামিসার আইনগত উত্তরাধিকার পাবে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান প্রত্যাশা করেন, উচ্চ আদালতে গেলেও এ রায় বহাল থাকবে। তিনি বলেন, প্রত্যেক ধাপ সম্পন্ন করে কার্যত ছয় কার্যদিবসের মধ্যে এ রকম বেদনাদায়ক একটি ঘটনার বিচার করা সম্ভব হলো। এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম। অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলছেন, রামিসা হত্যা মামলার রায় বিচারিক প্রক্রিয়ার মাইলফলক। তিনি আরও বলেন, হাইকোর্টে নথি পৌঁছালে দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে। রামিসার বাবা মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা এ রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সময়ে কাঙ্ক্ষিত রায় পেয়েছি।’ দ্রুত কার্যকর হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এই মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, কোনো ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারে এত দ্রুত রায় ঘোষণার নজির নেই। 

সম্প্রতি আমরা লক্ষ করেছি, দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণ অনেক বেড়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ভুক্তভোগীদের বেশির ভাগ শিশু। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যমতে, চলতি বছরের মে মাসে ২৫৯ জন নারী ও মেয়েশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে গণমাধ্যমের খবরে এসেছে। বলা হচ্ছে, এর মধ্যে ৫৯ মেয়েশিশুসহ ৭২ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন কারণে ১২ মেয়েশিশু, ৩৪ জন নারীসহ মোট ৪৬ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। 

বিচার না হওয়া এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় এসব অপরাধ ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। আমরা আশা করব, শুধু রামিসাই নয়, শিশু আছিয়া হত্যাকাণ্ডের মতো আরও যেসব হত্যাকাণ্ড এ দেশে ঘটেছে, সব অপরাধের বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। একটি স্বচ্ছ বিচার-প্রক্রিয়া অপরাধীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এর মাধ্যমে অপরাধীদের অপরাধ করতে গেলে একবার হলেও ভাবতে হবে। সরকার চাইলেই দ্রুত যে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়, তার নজির রামিসা হত্যাকাণ্ডে ফাঁসির রায়। এর মাধ্যমে জনগণের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি এসেছে যে, অপরাধ করলে অপরাধী শাস্তি পাবে। সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না হলে নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ হবে না। সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে এবং বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করবে, সেটিই কাম্য।

পুশইন নয়, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলুন শূন্যরেখায় মানবেতর জীবন

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৩:১৬ পিএম
শূন্যরেখায় মানবেতর জীবন

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) গত কয়েক দিনে বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে লোকজনকে আইনি বিধির তোয়াক্কা না করে জোরপূর্বক পুশইনের পথ বেছে নিচ্ছে। এটি যেমন নিন্দনীয়, তেমনি আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। তারা আইনের দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে রাতের আঁধারে বা সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব কাজ করছে। এই একতরফা নীতির কারণে সীমান্তের শূন্যরেখায় মানবিকসংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। গত কয়েক দিনে যশোর, ঝিনাইদহ, কুড়িগ্রাম, সিলেট, নওগাঁ, জয়পুরহাট, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে একাধিকবার পুশইনের ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তে আটকে থাকা ২৮ জনের কান্নায় জিরো লাইনের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। শিশুদের কান্না আর নারীদের আকুতি স্থানীয় সীমান্তবাসীকেও ব্যথিত করে তুলেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তীব্র রোদ, রাতের ঠাণ্ডা আর বৃষ্টি এবং খাদ্য ও সুপেয় পানির অভাবে, বিশেষ করে শিশুরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে। বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মানবিক কারণে কিছু জরুরি সহায়তা দেওয়া হলেও আইনি জটিলতায় তাদের স্থায়ী সমাধান মিলছে না। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, জাতীয়তা যা-ই হোক না কেন, বিচারহীনভাবে কোনো মানুষকে এভাবে জিরো লাইনে বন্দি করে রাখা এবং মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মারাত্মক লঙ্ঘন।

এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনার চিত্র নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে পুশইনের এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও উদ্বেগজনক প্রবণতা। কয়েক দিন ধরেই এই অপচেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এজেন্ডা এবং অনুপ্রবেশকারী দমনের নামে সীমান্তরক্ষী বাহিনী সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাংলাভাষী মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এ পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরাসরি অভিযোগ করেছে যে ভারত দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও সীমান্ত চুক্তি বজায় রেখে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অবৈধ বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠাচ্ছে না, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র থেকে জানা গেছে, এই অনিয়মতান্ত্রিক পুশইন বন্ধের জন্য ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ভারতকে স্পষ্ট জানিয়েছে, যেকোনো নাগরিককে ফেরত পাঠানোর জন্য দুই দেশের মধ্যে সুনির্দিষ্ট দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, প্রটোকল এবং আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী বা অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করলেই তাকে সরাসরি সীমান্তে এনে ছেড়ে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।

এদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, বাংলাদেশিসহ যেকোনো বিদেশি নাগরিক যদি ভারতে অবৈধভাবে অবস্থান করেন, তবে তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমাদের দেশে আইন রয়েছে। সেই আইন অনুযায়ীই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 
ভারতের বিএসএফের অবৈধ পুশইন ও চোরাচালান রোধে বাংলাদেশের সীমান্তগুলোতে নজরদারি ও জনবল বৃদ্ধি করেছে বিজিবি। সীমান্ত সুরক্ষার জন্য এটি আরও বাড়াতে হবে। ভারত একটি বন্ধুপ্রতিম বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এজেন্ডা এবং অনুপ্রবেশকারী ঠেকানোর নামে যে পুশইন তৎপরতা ভারত শুরু করেছে, তাতে এটি আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আশা করছি, দুই দেশের সম্পর্ককে গতিশীল ও দৃঢ় করতে ভারত আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে। একই সঙ্গে বড় দেশ হিসেবে ভারতকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। 

দেশে তীব্র তাপপ্রবাহ এখনই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিন

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০১:৩২ পিএম
এখনই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিন

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাপপ্রবাহ। সেই সঙ্গে আগুনে ঘি ঢালতে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সক্রিয় হচ্ছে ওশেনিয়া অঞ্চলের আবহাওয়ার বিপজ্জনক ধাপ ‘এল নিনো’। প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশ থেকে উঠে আসা এই উষ্ণ জলরাশি এবার ‘সুপার এল নিনো’ বা ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। ইতোমধ্যে দেশে একের পর এক জেলায় তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে। দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে মৃদু তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আগামী কয়েক দিন এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হলে বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, বৃষ্টিপাতের ঘাটতি, পানিসংকট, ফসলহানি, স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, পানিসম্পদ, জনস্বাস্থ্য এবং শ্রমনির্ভর জীবনযাত্রা সরাসরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। তাই তাপপ্রবাহকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে এখনই আমলে নিতে হবে। আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।

বৈশ্বিক জলবায়ু চক্রের চেয়েও দেশের ভেতরের মানবসৃষ্ট স্থানীয় বিপর্যয়গুলোই এ দাবদাহকে মানুষের সহ্যক্ষমতার বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। দেশে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ ও আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তনের পেছনে বৈশ্বিক কারণগুলোর চেয়ে স্থানীয় কারণ তথা জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নির্বিচারে বন উজাড় ও জলাশয় ভরাটকে প্রধান কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অনাবৃষ্টির হাত থেকে ফসল বাঁচাতে কৃষকরা এখন ব্যাপকভাবে গভীর নলকূপ ব্যবহার করছেন। এতে সরাসরি উৎপাদন ব্যাহত না হলেও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর মারাত্মকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। এতে সেচ দিতে গিয়ে কৃষকের উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশকে এখন তাপপ্রবাহ ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক নীতি, আগাম সতর্কবার্তা, নগর পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি হাতে নিতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন এখন শুধু পরিবেশগত সংকটই নয়, এটি জনস্বাস্থ্যসংকটে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ তাপপ্রবাহের ভয়াবহতা উপলব্ধি করেছে ২০২৪ সালে। সেই সময়টাতে অনেক অঞ্চলে স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। হাসপাতালে হিটস্ট্রেকা ও পানিশূন্যতার রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল নিম্ন আয়ের মানুষ। এ সময়ে বাতাসে জলীয়বাষ্প বেশি থাকায় মানুষ অনবরত ঘামছে এবং গরম বেশি অনুভূত হচ্ছে। এর ফলে মেগাসিটির বস্তিবাসী ও রিকশাচালক, হকার বা দিনমজুরের মতো শ্রমজীবী মানুষের ভোগান্তি বহু গুণ বেড়েছে। সারা দেশেও কয়েক দিন ধরে গরমের তীব্রতা বাড়ছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষই বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছেন। হাসপাতালগুলোতেও রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। অতিরিক্ত গরমে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ঠিকমতো কাজ করছে না অনেকের। এতে হিট স্ট্রোকের আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। এ সময়ে ডায়রিয়া, বমি, টাইফয়েড, আমাশয়, জন্ডিসসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগও দেখা দিচ্ছে।

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে তাপপ্রবাহের গতি প্রকৃতি দ্রুত বদলে গেছে। এ ধরনের প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই নিজের ও পরিবারের সুরক্ষায় সবাইকে সচেতন ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করতে হবে। সেই সঙ্গে সরকারকে তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সহায়তা প্রকল্প হাতে নেওয়া প্রয়োজন। গণমাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে। তাপমাত্রা কমাতে নগরাঞ্চলে সবুজ বনায়ন অর্থাৎ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। তাই এখনই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত অভিঘাত থেকে দেশকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

সিন্ডিকেটের কবল থেকে মুক্ত করুন কোরবানির চামড়া বিক্রিতে ধস

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:৫০ পিএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:৫২ পিএম
কোরবানির চামড়া বিক্রিতে ধস

তৈরি পোশাকশিল্পের পর দ্বিতীয় বৃহত্তর সম্ভাবনাময় খাত হচ্ছে চামড়াশিল্প। অথচ এই খাতটি অবহেলার শিকার। নানা সমস্যায় জর্জরিত এ শিল্প নিয়ে সরকারের কোনো দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনাও পরিলক্ষিত হয়নি। এবার ঈদুল আজহার প্রাক্কালে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী আশ্বাস এবং স্থানীয় প্রশাসনের তদারকিও কাজে আসেনি। খবরের কাগজের ব্যুরো অফিস, প্রতিনিধি, নিজস্ব প্রতিবেদকদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, কোথাও কোরবানির চামড়ার ন্যায্য দাম মেলেনি। ঈদুল আজহার আগে শিল্পমন্ত্রী কয়েক দফায় গণমাধ্যমে আশ্বাস দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এবার চামড়ার বাজারে কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না। চামড়া সরকারনির্ধারিত দামেই বিক্রি হবে। মাঠপর্যায়ে কোথাও যেন অনিয়ম না হয়, সে জন্য প্রশাসন কঠোর নজরদারি করবে। চামড়া যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য বাজারে প্রচুর পরিমাণে লবণ সরবরাহ করা হয়েছে। এমনকি চামড়া সঠিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। অথচ মাঠের বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন।

ঈদের দিনে পাইকারি আড়তগুলোতে চরম মন্দাভাব দেখা যায়। রিকশাভ্যান ও ট্রাকে করে চামড়া নিয়ে আসা কোরবানিদাতা, মৌসুমি ব্যবসায়ী ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ বিপাকে পড়ে। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকারনির্ধারিত দামে আড়তদাররা চামড়া কিনছেন না। তারা সিন্ডিকেট করে নিজেদের ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করে চামড়া কিনছেন। কোরবানির চামড়ার বাজারে আকর্ষিক এই দরপতনে তাদের দিশেহারা অবস্থা। নিরুপায় হয়ে চামড়া সংগ্রহকারীরা আড়তের সামনে চামড়া ফেলে রেখে চলে গেছেন। কিছু কিছু এলাকায় চামড়া মাটিতে চাপা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। আবার কোথাও ক্রেতা না পেয়ে অনেকে চামড়া রাস্তায় ফেলেও দিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এক যুগ ধরে কোরবানির চামড়ার বাজারে চরম অস্থিরতা চলছে। প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট কৌশলে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই সিন্ডিকেট সরকারের বেঁধে দেওয়া দামকে তোয়াক্কা করে না। তারা অনেক কম দামে চামড়া কেনে। ফলে প্রতিবছর প্রচুর চামড়া নষ্ট হয়। মূলত সঠিক সংরক্ষণের অভাবে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। চামড়ার বাজারের এই অস্থিরতা দূর করতে শিল্প মন্ত্রণালয় একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সেই প্রতিবেদনেও সরকারি উদ্যোগে চামড়া সংরক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি কারখানাগুলোর অব্যবহৃত জায়গায় সংরক্ষণ কেন্দ্র করা সম্ভব। এসব কেন্দ্রে আশপাশের এলাকা থেকে চামড়া সংগ্রহ করে সহজেই সংরক্ষণ করা যাবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, প্রতিবছর কোরবানির পশুর চামড়া কেনাবেচা নিয়ে চরম নৈরাজ্য হয়। সরকারকে দ্রুত এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে। সরকার বিভাগীয় শহরগুলোতে বিসিকের শিল্পপ্লট ব্যবহার করতে পারে। সেখানে চামড়া সংরক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। মৌসুমি ব্যবসায়ী ও কোরবানিদাতারা চামড়া কেনার পর সেখানে তা সংরক্ষণ করবেন। পরবর্তী সময় ভালো দাম পাওয়া গেলে আড়তদার ও ট্যানারিমালিকদের কাছে তা বিক্রি করা যাবে। এতে চামড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকবে না। একই সঙ্গে কম দামে দ্রুত চামড়া বিক্রি করার লোকও থাকবে না।

প্রতিবছর কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে যে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়, তাতে চামড়ার ন্যায্য দাম নিশ্চিত হয় না। সেই সঙ্গে কোরবানিদাতা, মৌসুমি ব্যবসায়ী ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ চামড়া নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ে। অথচ একসময় কোরবানির মৌসুমে ছাগল, বকরি ও খাসির চামড়া ছিল গ্রামের দরিদ্র মানুষ, মাদ্রাসা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের বাড়তি আয়ের অন্যতম উৎস। সেই চামড়া এখন অনেকের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে রপ্তানিযোগ্য এই অর্থকরী পণ্যের বড় একটি অংশ অর্থনীতির বাইরে চলে যাচ্ছে। তাই সংকট উত্তরণে সরকারকে টেকসই সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। চামড়া সঠিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণের জন্য সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এবার চামড়ার বাজারে যে ধস লক্ষ করা গেছে, তা যেন পরবর্তী সময়ে না হয়, সে ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। সরকারি সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা না করে যারা সিন্ডিকেট করে এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আশা করছি, সরকার চামড়ার নৈরাজ্য দূরীকরণে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হবে।