ভাবসম্প্রসারণ
মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে,
হারা শশীর হারা হাসি, অন্ধকারেই ফিরে আসে।
ভাব সম্প্রসারণ: জীবনে দুঃখ-যন্ত্রণা চিরস্থায়ী নয়। দুঃখ-দুর্দশায় আমাদের ভেঙে পড়া উচিত নয়। কেননা, দুঃখ-দুর্দশার মধ্য দিয়েই জীবনে আসে সত্যিকারের সুখ।
মানুষের জীবন দুঃখ-সুখের সুতায় বোনা। এখানে সুখ ও দুঃখ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু মানুষ শুধু সুখের আশা করে; দুঃখ-যন্ত্রণা এড়িয়ে যেতে চায়। দুঃখ-কষ্ট মাড়িয়ে সুখ অর্জন করতে হয়। জীবনে কখনো দুঃখ উঁকি দেয়, আবার কখনো-বা সুখ উঁকি দেয়। জীবনে দুঃখ-দুর্দশায় আমাদের ভেঙে পড়া উচিত নয়। কারণ, দুঃখ-কষ্ট জীবনে স্থায়ী রূপ নেয় না। দুঃখের পরেই সুখ আসে। যেমন রাতের পরেই দিন আসে। দুঃখের অগ্নিপরীক্ষার ভেতর দিয়েই মানুষের জীবন শুচি-শুভ্র হয়ে ওঠে। দুঃখই তাকে দান করে মহিমা। দুঃখের সিঁড়ি বেয়েই আসে সত্যিকার সুখ ও শান্তি। মেঘের আড়ালেই লুকানো থাকে দিবসের প্রদীপ্ত সূর্য। মেঘ যত গভীর এবং ঘনতরই হোক না কেন, সে সূর্যকে সবসময় আড়াল করে রাখতে পারবে না। মেঘ কেটে গেলেই হেসে উঠবে সূর্য। অমাবস্যার অন্ধকার সাময়িকভাবে চাঁদকে গ্রাস করতে পারলেও, সেই অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে হেসে উঠে নতুন চাঁদ। সে রকম জীবনে দুঃখ-যন্ত্রণা সাময়িক সময়ের জন্য আসে; পরক্ষণে কিছুদিন পরে তা তিরোহিত হয়ে যায়। মানুষের জীবনে কোনো দুঃসময়ই চিরস্থায়ী বা অনিবার্য নয়। ধৈর্য ধরে দুঃসময়কে অতিক্রম করতে পারলেই সুখ-সূর্য বা সুখ-চাঁদের সন্ধান মেলে। জীবন তখন পুনরায় সুন্দর ও উপভোগ্য হয়ে ওঠে। সুতরাং দুঃখ ও বিপদে ভেঙে পড়া উচিত নয়; বরং বলিষ্ঠ আত্মবিশ্বাসে তার মোকাবিলা করতে হবে। আর তাতেই জীবনে সুখ-শান্তি, সাফল্য ও সমৃদ্ধি আবির্ভূত হবে।
সুখ ও দুঃখ পর্যায়ক্রমে আসে। তাই দুঃখকে ভয় না করে সুখ ও দুঃখ উভয়কেই সমানভাবে গ্রহণ করা উচিত। অন্যদিকে, জীবনে সুখ-শান্তি, সাফল্য পেতে হলে দুঃখ-যন্ত্রণার সঙ্গে সংগ্রাম করে জীবনে আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করতে হবে।
আরো পড়ুন : ৩টি ভাবসম্প্রসারণ, ৩য় পর্ব, ৯ম, ১০ম ও এসএসসি বাংলা ২য় পত্র
দুর্জন বিদ্বান হইলেও পরিত্যাজ্য
ভাবসম্প্রসারণ: বিদ্বান যদি চরিত্রহীন বা দুর্জন হয় তবে তাকে দিয়ে কোনো উপকার আশা করা অনুচিত। চরিত্রহীন ব্যক্তি প্রচুর জ্ঞানের অধিকারী হলেও তার সঙ্গ সর্বদাই পরিত্যাগ করা উচিত।
‘দুর্জন’ শব্দের আভিধানিক অর্থ দুষ্ট বা খল ব্যক্তি। ‘বিদ্বান’ শব্দের অর্থ পণ্ডিত, সুশিক্ষিত বা জ্ঞানী ব্যক্তি। সাধারণত মিথ্যাবাদী, দুর্নীতিপরায়ণ ও চরিত্রহীন লোককে এককথায় দুর্জন বলা হয়ে থাকে। চরিত্র হলো মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। চরিত্রবান ব্যক্তি সবসময় কল্যাণ ও সত্যের প্রতি তীব্রভাবে অনুরক্ত থাকেন। চরিত্রবান ব্যক্তি তার সব জ্ঞানকে সত্য ও কল্যাণের পথে চালিত করে। তিনি অহংকারহীন, হিংসা-বিদ্বেষহীন সংযত জীবনযাপন করেন। মূলত কথায়, কাজে এবং চিন্তায় সামঞ্জস্য রক্ষিত হলে মানুষের মধ্যে যে পবিত্র ভাব ফুটে ওঠে তাকে চরিত্র বলে অভিহিত করা যায়। দুর্জন লোকের চরিত্রে এসব গুণের সমাবেশ দেখা যায় না। আমরা জানি বিদ্যা মানুষের অমূল্য সম্পদ, বিদ্যা মানুষের মনের চোখ খুলে দেয়। বিদ্যা অর্জনের মাধ্যমে একজন মানুষ পৃথিবীর যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারে। শুধু তাই নয় মানুষ, সমাজ, জাতির কল্যাণ কীভাবে করা যায়, তার যাবতীয় নির্দেশনাও মানুষ বিদ্যা শিক্ষার মাধ্যমে জানতে পারে। সর্বোপরি একজন বিদ্বান লোক দেশ ও জাতির কল্যাণে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু বিদ্বান ব্যক্তি যদি চরিত্রহীন হয় তবে তার যাবতীয় জ্ঞান সুস্থ-সুন্দর পথে কাজে না লাগিয়ে অমঙ্গলের পথে, অসুন্দরের পথে কাজে লাগাতে পারেন; যা সমাজের জন্য হুমকিস্বরূপ। বিদ্বান যদি হয় দুষ্ট বুদ্ধিসম্পন্ন, চরিত্রহীন, লম্পট তবে তার মতো দুষ্টক্ষত সমাজে আর নেই। বিদ্বান ব্যক্তি শ্রদ্ধাভাজন হলেও চরিত্রহীন বিদ্বান ভয়ংকর। সে লোক সমাজে কখনো সম্মান লাভের যোগ্য হতে পারে না। চরিত্রহীন বিদ্বান তার বিদ্যাকে অন্যায় কাজে লাগিয়ে থাকে। সুতরাং তার চিন্তা-চেতনার সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। একসময় এই বিশ্বাস করা হতো যে, কোনো কোনো বিষধর সাপের মাথায় মণি থাকে। মণি বহু মূল্যবান বটে। কিন্তু তাই বলে মণি লাভের জন্য সাপের সাহচর্য বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সেরূপ বিদ্যালাভের জন্য দুর্জনের কাছে যাওয়া মোটেও উচিত নয়। কারণ, দুর্জনের সাহচর্যে নিষ্কলুষ ব্যক্তির চরিত্রও কলুষিত হতে পারে। ফলে মানবজীবনের অমূল্য সম্পদ চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সৎ মানুষের সঙ্গে বসবাস অনেকটা স্বর্গবাসের মতো, পক্ষান্তরে অসৎ মানুষের সঙ্গে বসবাস নরকবাস বা সর্বনাশের মতো। তাই বিদ্বান ব্যক্তি সৎ কি না সেটা অবশ্যই বিবেচ্য; সৎ না হলে তার সঙ্গ পরিত্যাগ করাই যুক্তিসংগত।
আমাদের সমাজে বিদ্বান ব্যক্তির যেমন অভাব নেই তেমনি দুর্জন ব্যক্তিরও অভাব নেই। আমাদের উচিত চরিত্রবান বিদ্বান ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা এবং তাদের সাহচর্য লাভ করা, অন্যদিকে দুর্জন ব্যক্তিকে সবসময়ই এড়িয়ে চলা।
আপনি আচরি ধর্ম শেখাও অপরে
ভাবসম্প্রসারণ: ব্যক্তির জীবনাচরণের মধ্যে যা নেই, তা অন্যকে উপদেশ আকারে দেওয়া যায় না। অন্যকে উপদেশ দেওয়ার আগে নিজেকে তা পালন করে দেখাতে হয়। এর ফলে যাকে উপদেশ দেওয়া হয়, সে পালন করতে আন্তরিকভাবে উদ্বুদ্ধ হয়।
আমাদের সমাজে উপদেশ দেওয়ার মানুষের অভাব নেই। আমাদের সমাজ ও দেশে এমন অনেক লোক রয়েছে যারা উপদেশ দিতে খুবই পছন্দ করে থাকে। তবে তাদের নিজেদের জীবনে সে কাজের প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায় না। অর্থাৎ তারা যে কাজের উপদেশ দেয় সেই কাজে নিজেকে সফল করতে পারে না। অসফল ব্যক্তিরা যখন কাউকে কোনো কিছু শিক্ষা দিতে চেষ্টা করে, তখন কিন্তু সেটা খুব কমই গ্রহণযোগ্য মনে করে। ভালো কাজ করতে বলা খুবই সহজ, তবে ভালো কাজ করে দেখানো অনেক কঠিন। অর্থাৎ সবাই ভালো কাজের উপদেশ দিতে পারলেও, সেই কাজটা করে দেখাতে অনেকে পারে না। মানবজাতির স্বভাব হলো অন্ধকার ও নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষণ। অর্থাৎ আমাদের অনেকেই অন্ধকার ও নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। কারণ, এসব খারাপ কাজে মানুষ সহজাত প্রবৃত্তিগতভাবে আকৃষ্ট হয়। তবে এসব থেকে দূরে থেকে জীবনে সুন্দর ও সত্যের বিকাশ ঘটানোই প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু এসব মিথ্যা ও অন্ধকার জীবনকে উপেক্ষা করে সততার পথ অবলম্বন করা ভীষণ কঠিন হয়ে যায়। আর এই কঠিন কাজটি নিজে সম্পূর্ণ করার পরই কেবল অন্যদের শিক্ষা দেওয়া উচিত। অর্থাৎ আমি আগে নিজে শিক্ষা গ্রহণ করার পর, অপরকে সেই জিনিসটা শিক্ষা দিলে বেশি প্রাধান্য পাবে। তবেই সেই শিক্ষা মানুষের কাছে অর্থবহ হয়ে উঠবে ও অধিক গ্রহণযোগ্যতা পাবে। একজন নীতিবান ও সত্যিকারের মানুষ তার সারা জীবনে ন্যায়, নীতি, বিনয়ী ও উদারতা প্রকাশ করলেই কেবল অন্যরা তার কাছ থেকে উপদেশ গ্রহণ করবে। তখন আর আপনার অন্যকে উপদেশ দিতে হবে না। অন্য সব মানুষ আপনার কাছে উপদেশ নিতে আসবে। এই বিষয়ে একটি বাস্তব উদাহরণ হলো- একদিন এক নারী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে এসে একটি বিষয়ে পরামর্শ চান। সে নারীর ছেলে মিষ্টি খেতে খুবই পছন্দ করে। তখন সেই নারী মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে তার ছেলেকে মিষ্টি খেতে নিষেধ করার জন্য অনুরোধ করেন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সেই নারীকে আগে মিষ্টি পরিহার করতে বলেন। তারপর তিনি তার সন্তানকে মিষ্টি খাওয়া থেকে বিরত থাকতে বলতে পারবেন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সেই মাকে এক সপ্তাহ পরে আসতে বলেন। তারপর এই এক সপ্তাহে তিনি আগে মিষ্টি খাওয়া পরিহার করেন, তারপর সেই ছোট ছেলেটিকে মিষ্টি খেতে নিষেধ করেন। এরূপ উদাহরণ থেকে বোঝা যায় যে, নিজে না করে, অন্যকে কিছু করতে বলাটাই অন্যায়। ধরুন, আপনার সন্তান ধূমপান করে, তাহলে আপনাকে প্রথমে ধূমপান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। তারপর আপনার ছেলেকে ধূমপান করা থেকে নিষেধ করতে হবে। তাহলে দেখবেন এটা কাজে লাগবে। শুধু আমাদের ইসলাম ধর্মেই এই কথা আছে তা কিন্তু নয়, অন্যান্য প্রায় সব ধর্মেই একই কথা বলা আছে। ইসলামী মনীষী ও গুণিজনদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এই বিষয়টি লক্ষ করা যাবে। তাদের চরিত্র এরূপ গুণেই গুণান্বিত ছিল। তারা সবসময় আগে ভালো কাজ করতেন। তারপর অন্য সব মানুষকে ভালো কাজ করার জন্য উপদেশ দিতেন। সুতরাং উপদেশ দেওয়ার আগে আমাদের অবশ্যই চিন্তা করতে হবে আমরা নিজেরা কাজটি করতে কতটুকু সক্ষম।
কাউকে উপদেশ দেওয়ার মধ্য দিয়ে ভালো মানুষ সাজার ভান করা খুব সহজ, কিন্তু উপদেশ পালন করা খুব কঠিন কাজ। তবে সেই উপদেশদাতাই সর্বোত্তম, যিনি নিজে যা পালন করেন, অন্যকেও তা পালন করতে বলেন।
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক (বাংলা)
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল, ঢাকা
কবীর