ভাবসম্প্রসারণ
আপনার লয়ে বিব্রত রহিতে
আসে নাই কেহ অবনী পরে,
সকলের তরে সকলে আমরা
প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।
অথবা, পুষ্প আপনার জন্য ফোটে না।
ভাবসম্প্রসারণ: ভোগে নয়, ত্যাগেই মানুষের প্রকৃত সুখ ও মুক্তি। অন্যের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার মধ্যেই রয়েছে মানবজীবনের সার্থকতা।
মানুষকে তার অর্জিত গুণাবলি আত্মস্বার্থে ব্যয় করলে চলবে না, পরের জন্য ভাবতে হবে। ফুল যখন গাছের ডালে ফোটে, তখন তার সৌন্দর্য রূপপিয়াসী মানুষকে মুগ্ধ করে, মধুলোভী মৌমাছিকে আকর্ষণ করে। মানুষ প্রশংসা করে তার সৌন্দর্যের, ঘ্রাণ নিয়ে মুগ্ধ হয়। মেয়েরা খোঁপায় গোঁজে ফুল, সাজায় ফুলদানিতে। মধুকর পান করে ফুলের মধু, গড়ে তোলে মৌচাক। এভাবে একসময় ফুল শুকিয়ে যায়, ঝরে পড়ে। অপরের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে ফুল তার জীবন সার্থক করে তোলে। পৃথিবীর বুকে এমন অনেক মহৎপ্রাণ ব্যক্তি আছেন, যারা ফুলের মতোই অন্যের কল্যাণে নিজের মেধা, জ্ঞান, শ্রম, এমনকি মূল্যবান জীবনকে উৎসর্গ করে গেছেন। ইতিহাসের পাতায় তারাই স্মরণীয়-বরণীয় হয়ে আছেন। উদাহরণ হিসেবে আমরা বলতে পারি, হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এ পৃথিবীতে সব সময় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও পরের উপকারের জন্য অনেক ভালো কাজ করে গেছেন। যেমন- তিনি তার প্রথম স্ত্রী খাদিজা (রা.)-এর কাছ থেকে বেশ কিছু সম্পত্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সেগুলো শুধু নিজের জন্য ব্যবহার না করে গরিবদের দান করে গেছেন। আবার মাদার তেরেসা মানব সেবার জন্য বিভিন্ন ধরনের সেবামূলক সংগঠন গড়ে তুলেছেন। যেমন- মিশনারিজ অব চ্যারিটি, নির্মল হৃদয়, প্রেমনিবাস, শিশুভবন ইত্যাদি। তিনি ১৯৭৯ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের যে অর্থ পেয়েছিলেন, সেটিও তিনি গরিব অসহায় মানুষের জন্য ব্যয় করেছেন। এভাবে অনেক পরোপকারী মানুষ রয়েছেন, যারা সারা জীবন অন্যের জন্য উৎসর্গ করেছেন। এজন্যই হয়তো কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় লিখেছেন- ‘যাহারা এ পৃথিবীতে হয়ে গেছেন চিরধন্য/ নিজের জন্য ভাবেনিক ভেবেছিলেন পরের জন্য।’ বস্তুত নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা মানুষের গুণ নয়, স্বার্থসর্বস্ব পশুর বৈশিষ্ট্য। আমরা প্রত্যেকেই পৃথিবীতে এসেছি একে অপরের জন্য জীবনধারণ করে সার্থক হতে, মনুষ্যত্বের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে।
ফুলের জীবনের কাছে মানুষের অনেক কিছু শেখার আছে। ফুল অন্যের জীবন সাজাতে, সুন্দর করতে, সৌরভময় করতে নিজের জীবন উৎসর্গ করে। পরার্থে জীবন উৎসর্গ করতে পারলে, মানুষের জীবনও ফুলের মতো সুন্দর ও সৌরভময় হয়ে উঠতে পারে।
আরো পড়ুন : ৩টি ভাবসম্প্রসারণ, ৩য় পর্ব, ৯ম, ১০ম ও এসএসসি বাংলা ২য় পত্র
বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে
ভাবসম্প্রসারণ: প্রকৃতির সবকিছুরই একটি স্বাভাবিক সৌন্দর্য আছে এবং সেই সৌন্দর্য যথোপযুক্ত পরিবেশেই স্বতঃস্ফূর্ত ও আকর্ষণীয়। এর ব্যতিক্রম করলেই সৌন্দর্যের ম্লান ঘটে।
স্থান-কাল-পাত্রের ওপর সৌন্দর্যের পূর্ণতা নির্ভর করে। যে জিনিস যে স্থানে থাকা উচিত, সেখানে থাকলে তাতে যে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হয় তা নয়, দেখতে সুন্দরও লাগে। যথার্থ স্থানেই বস্তুর স্বাভাবিক বিকাশ হয়। অস্থানে, কৃত্রিমভাবে যতই তাকে পরিচর্যা করা হোক, তার স্বাভাবিক বিকাশ ও বৃদ্ধি ঘটবে না। মায়ের কোলে শিশুকে যেমন সুন্দর দেখায়, অন্য কারও কোলে শিশুকে তত সুন্দর মানায় না। এজন্য অনেক বড় বড় শিল্পী মা ও শিশুর ছবি এঁকেছেন, যেখানে শিশুকে মাতৃক্রোড়েই দেখানো হয়েছে। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এবং পাবলো পিকাসো ছাড়াও আরও অনেকে ক্ল্যাসিকাল ও আধুনিক শিল্পী শিশুকে মাতৃক্রোড়েই স্থান দিয়েছেন। তেমনি ফুল যতক্ষণ গাছের ডালে প্রস্ফুটিত থাকে, ততক্ষণ তার মধ্যে স্বর্গীয় সৌন্দর্য বিরাজ করে। কিন্তু বোঁটা থেকে ছিঁড়লে ফুলের সেই স্বাভাবিক সৌন্দর্য আর থাকে না। আবার বন্যপ্রাণীদের বনে যেমন সুন্দর দেখায়, লোকালয়ে তাদের সৌন্দর্য তত বিকশিত হয় না। বনের কোনো প্রাণীকে নাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে শহরে আনলে তাকে সার্কাসের উপহাস্যম্পদ ঘটনার মতোই মনে হবে, তার চেহারা মানুষকে সুড়সুড়ি দিয়ে হাসাবে, কিন্তু আনন্দ দেবে না। অথচ সেই জীবকেই যদি তার নিজস্ব স্থানে স্বাধীন প্রকৃতির কোলে বিচরণত অবস্থায় দেখা যায়, তাহলে তার সৌন্দর্যে মানুষের চোখ জুড়িয়ে যাবে। তেমনি মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ানো পাখির যে আনন্দ, বন্দি পাখির জীবনে তা নেই। উদার অসীম নীল আকাশের মাঝে পাখা মেলালেই যেন তার সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। কিন্তু সেই পাখিকে যদি কোনোক্রমে ধরে খাঁচায় আটকানো হয়, তাহলে তার মধ্যে আর প্রাণচাঞ্চল্য থাকে না। আমরা কবি বন্দে আলী মিয়ার ‘পাখি’ কবিতার মূলভাবেও দেখতে পাই যে, খোকা পাখিকে পোষ মানার জন্য খাবার দিয়ে খাঁচায় কিছুদিন বন্দি করে রাখার চেষ্টা করেও পারেনি। একবার খাঁচার দুয়ার খোলা থাকায় সুযোগ পেয়ে পাখিটি উড়ে মুক্ত বিহঙ্গে পালিয়ে যায়। এজন্য একটি প্রবাদে বলা হয়েছে, ‘যার যেখানে স্থান, তাকে সেখানেই থাকতে দাও।’ যার যে কাজ, তাকে সে কাজ করতে দাও। তাকে স্থানান্তর করলে সৌন্দর্যের অবলুপ্তি ঘটে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘স্বস্থানে সকল জিনিসই ভালো, অস্থানে পতিত ভালো জিনিসও জঞ্জাল। চোখের কাজল গালে লেপিলে লজ্জার বিষয় হয়ে ওঠে।’ তাই ইংরেজিতে ‘Right man in the right place’ বলে যে কথা আছে, তাকে পরিবেশের প্রেক্ষিতে ‘Right thing in the right place’ হিসেবেও গ্রহণ করা যেতে পারে।
স্বাভাবিক স্থানে বস্তুর স্বাভাবিক বিকাশ ঘটে। তাকে স্থানান্তর করলে পরিবেশের ভারসাম্য যেমন নষ্ট হয়, তেমনি সৌন্দর্যেরও হানি ঘটে।
প্রাণ থাকলেই প্রাণী হয়, কিন্তু মন না থাকলে মানুষ হয় না
ভাবসম্প্রসারণ: প্রাণ বা আত্মা থাকলেই মানুষকে প্রকৃত মানুষ বলা যায় না। ব্যক্তিত্ব, মননশীলতা ও মনুষ্যত্বের শক্তিতেই মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়।
যার প্রাণ আছে তাকেই প্রাণী বলে। সেদিক থেকে মানুষের প্রাণ আছে বলে মানুষও এক ধরনের প্রাণী। কিন্তু অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে মানুষের অনেক পার্থক্য রয়েছে। মানুষ বিবেক ও বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী। মানুষের মনে যে বিশেষ সত্তা রয়েছে তা এই পার্থক্যের কারণে, অন্য প্রাণীর মধ্যে এই বিবেক, মন ও বুদ্ধির পরিচয় অনুপস্থিত। মানুষ তার বিবেক ও মন দিয়ে সাধনা করে জীবনের বিকাশ ঘটায়। মানুষ মন থেকে তার চিন্তা-ভাবনা, বুদ্ধি-বিবেক, আবেগ-অনুভূতি ইত্যাদি প্রকাশ করে এবং জীবনে সেগুলোর প্রতিফলন ঘটায়। মনের কার্যকলাপ থেকে সভ্যতা-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটেছে। মানুষের এ বৈশিষ্ট্যটি প্রাণিজগতের আর কারও নেই। তাই সব প্রাণীর মধ্যে মানুষের স্থান ও মর্যাদা বেশি। এই শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার জন্য মানুষকে মননশীলতার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। যে মানুষ পশুসুলভ আচরণ করে, যার মধ্যে মানবতাবোধ নেই, তাকে সত্যিকার অর্থে মানুষ বলা যায় না। এ প্রসঙ্গে জনৈক দার্শনিক বলেছেন- ‘Every man has five sense. Commomsense is none of them. But without it a man turns into a nonsense.’ অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষের পাঁচটি ইন্দ্রিয় (নাক, কান চোখ, জিহ্বা ও ত্বক) আছে। বিবেক এই ইন্দ্রিয়গুলো থেকে আলাদা। কিন্তু এটা ছাড়া একজন মানুষ পশুতে পরিণত হয়ে যায়। অর্থাৎ বিবেকহীন মানুষ হয়ে যায় পশু। আবার প্রাবন্ধিক মোতাহের হোসেন চৌধুরী তার ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধে বলেছেন- ‘মানুষের মধ্যে দুটি সত্তা রয়েছে। একটি হচ্ছে জীবসত্তা, অপরটি হচ্ছে মানবসত্তা। যার মধ্যে জীবসত্তার চেয়ে মানবসত্তার গুরুত্ব বেশি নেই, সে প্রকৃত মানুষ না।’
মানুষ কেবল প্রাণের অধিকারী হলেই হবে না, ভালো মনের অধিকারীও হতে হবে। যে মন অন্যকে ভালোবাসবে, সে অন্যের ভালোবাসা পাবে। তাই মানুষ হতে হলে কেবল প্রাণ থাকলেই চলবে না। শিক্ষা, সাধনা ও অনুশীলনের মাধ্যমে মানবিক গুণাবলি আয়ত্ত করে সত্যিকারের বিবেকবান মনের মানুষ হতে হবে।
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক (বাংলা)
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল, ঢাকা
কবীর