প্রবন্ধ রচনা
বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প
ভূমিকা: ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া...
একটি ধানের শিষের উপর একটি শিশির বিন্দু।’
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মানুষ ভ্রমণ করতে পছন্দ করে। এই পছন্দকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পর্যটনশিল্প। এই শিল্পের কাজ হলো কোনো অঞ্চলের দর্শনীয় স্থানগুলোর তথ্য ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে তুলে ধরা, মানুষকে ভ্রমণে সহায়তা করা এবং এর মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করা। বাংলাদেশের একাধিক বনাঞ্চল, পাহাড়-নদী-ঝরনা, শস্যশোভিত মাঠ ও সবুজ প্রকৃতি, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, নান্দনিক স্থাপত্য ও ভাস্কর্য, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ও নিদর্শন প্রভৃতি দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণ করে। তাই বাংলাদেশে পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা প্রচুর। এগুলো দেখতে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে আসে। এভাবে বাংলাদেশ পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পর্যটনের সংজ্ঞা: অল্প কথায় বা নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ডের আলোকে পর্যটনকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। কারণ, একেকজনের দৃষ্টিতে পর্যটন একেক রকম। সহজ কথায়, পার্থিব সৌন্দর্য উপভোগ করার উদ্দেশ্যে মানুষের দর্শনীয় স্থানে অবস্থান এবং এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কর্মকাণ্ডকে পর্যটন বলে। পর্যটনকে কেন্দ্র করে যখন অর্থনীতি আলাদা একটি গতি পায় তখন তাকে পর্যটনশিল্প বলে। আন্তর্জাতিক পর্যটন সংস্থার সংজ্ঞানুযায়ী ‘পর্যটন হলো কোনো উপার্জনমূলক কাজে যুক্ত নয় এবং স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে না এমন ব্যক্তির ভ্রমণ এবং কোথাও বেড়াতে যাওয়ার পর উৎসারিত প্রপঞ্চ এবং সম্পর্কের সমষ্টি।’
পর্যটনশিল্পের গুরুত্ব: একটি দেশের পর্যটনশিল্প বিকশিত হলে সেই দেশের সংস্কৃতিও সমৃদ্ধ হয়। পর্যটন এলাকায় অধিবাসীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি ত্বরান্বিত হয়। পর্যটকদের আগ্রহ রয়েছে এমন স্থান, স্থাপনা বা বিষয়ের প্রতি স্থানীয় অধিবাসীরাও শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠে। তখন তারা নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষায় তাগিদ অনুভব করে। এ ছাড়া পর্যটনের সূত্রে একটি দেশের বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে মেলবন্ধন হয়, যা মানবিক বিশ্ব তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
পর্যটনকেন্দ্রগুলো: বাংলাদেশ অনেক সুন্দর। এ দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অনেকেই মুগ্ধ হয়। তাই তো কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় লিখেছেন-
“এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,
সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি।”
বাংলাদেশে অনেক পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। যেমন-
১. সুন্দরবন: বাংলাদেশের উপকূলবর্তী খুলনা অঞ্চলে ৬ হাজার বর্গকিলোমিটারের অধিক জায়গাজুড়ে সুন্দরবন অবস্থিত। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও বরগুনায় এর অবস্থান। সুন্দরী বৃক্ষ, গোলপাতাসহ নানা জাতের উদ্ভিদ এবং চিত্রল হরিণ, বাঘ, বানর, হনুমানসহ নানা জাতের পশুপাখির আবাস এই সুন্দরবনে। অভ্যন্তরে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য খালে রয়েছে কুমির। রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকরা নৌযানে করে সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে যান। ভয় ও ভালো লাগার অপূর্ব মিশেলের কারণে সুন্দরবন ভ্রমণ যেকোনো পর্যটকের স্মৃতিতে স্মরণীয় হয়ে থাকে।
আরো পড়ুন : কৃষিকাজে বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা, ২য় পর্ব
২. সিলেটের রাতারগুল: সিলেট জেলার গোয়াইনঘাটে অবস্থিত রাতারগুল জলাবন বাংলাদেশের একমাত্র মিঠাপানির বন। এর আয়তন ৩ হাজার ৩২৫ একর। ১০ ফুট গভীর পানির ওপর বনের গাছপালা জেগে থাকে। বর্ষাকালে পানির গভীরতা হয় ২০-৩০ ফুট পর্যন্ত। পর্যটকদের নৌকায় করে বনের মধ্যে প্রবেশ করতে দেখা যায়। এখানে উপভোগ করার মতো আছে কদম, হিজল, অর্জুন, ছাতিম প্রভৃতি গাছের সৌন্দর্য। বেড়াতে গিয়ে দেখা হয়ে যায় বানর, বেজি, গুইসাপ কিংবা সাদা বক, মাছরাঙা, পানকৌড়ি প্রভৃতি প্রাণী ও পাখির সঙ্গে।
৩. সমুদ্রসৈকত: কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত পৃথিবীর দীর্ঘতম (১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ) প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত। সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পর্যটকরা ভিড় করেন কক্সবাজারে। সমুদ্র ছাড়াও কক্সবাজারে রয়েছে একাধিক ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ধর্মীয় উপাসনালয় ও বুদ্ধ মূর্তি। স্থাপত্যশিল্পের বিচারে এগুলো অমূল্য। এ ছাড়া চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, কক্সবাজারের ইনানী, পটুয়াখালীর কুয়াকাটা, সুন্দরবনের কটকা প্রভৃতি সমুদ্রসৈকতে ভ্রমণপিপাসুরা বেড়াতে যান। বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত সেন্টমার্টিন দ্বীপ বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। দ্বীপজুড়ে রয়েছে নারিকেল গাছ। দ্বীপ থেকে সমুদ্রের নীল জলরাশির সৌন্দর্য উপভোগ করতে এবং নানা রকমের প্রবাল দেখতে পর্যটকরা সেন্টমার্টিন দ্বীপে ভ্রমণ করেন।
৪. পার্বত্য অঞ্চল: বাংলাদেশের পার্বত্য জেলাগুলো অর্থাৎ রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাক্ষেত্র। একদিকে সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় উঠে মেঘ ছোঁয়ার আনন্দ, অন্যদিকে প্রাকৃতিক জলের উৎস ঝরনাধারা পর্যটকদের অভিভূত করে। রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে নৌকায় ভেসে বেড়ানো যায়। হ্রদের ওপর একটি সুদৃশ্য ঝুলন্ত সেতু রয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলার অন্তর্গত আলুটিলা পাহাড়, রিসাং ঝরনা, মায়াবিনী লেক প্রভৃতি স্থানে ভ্রমণের হাতছানি পর্যটকরা অগ্রাহ্য করতে পারে না। সিলেটের জাফলংয়ের পিয়াইন নদীতে মনোমুগ্ধকর পাথুরে জলের ধারা, মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ড ঝরনা; হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ের চা বাগান; শ্রীমঙ্গলের ইকোপার্ক প্রভৃতি স্থান প্রায় সারা বছরই পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত থাকে। এ অঞ্চলগুলোয় ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষদের বর্ণিল জীবনাচারও পর্যটকদের অনেক আকর্ষণ করে। বাংলাদেশের একমাত্র পার্বত্য দ্বীপ মহেশখালী। বিখ্যাত আদিনাথ মন্দির ও বড় রাখাইনপাড়া বৌদ্ধমন্দির এই দ্বীপেই অবস্থিত।
৫. পুরাকীর্তি: বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। পুরান ঢাকার লালবাগে অবস্থিত মুঘল স্থাপত্য লালবাগ কেল্লা, বুড়িগঙ্গার তীরে নির্মিত আহসান মঞ্জিল, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে গড়ে ওঠা অনুপম স্থাপত্য শৈলীবিশিষ্ট পানাম নগর, কুমিল্লায় আবিষ্কৃত প্রাচীন নগর ময়নামতি, বগুড়ার প্রাচীন পুরাকীর্তি মহাস্থানগড়, নরসিংদীর বেলাব উপজেলার অন্তর্গত আড়াই হাজার বছর পূর্বের প্রত্ননিদর্শন সংবলিত উয়ারী ও বটেশ্বর গ্রাম, নওগাঁয় আবিষ্কৃত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহার পাহাড়পুর, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাচীন ও আধুনিক স্থাপত্যকলার বহু নিদর্শন রয়েছে।
(বাকি অংশ আগামীকাল প্রকাশ)
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক (বাংলা)
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ,মতিঝিল, ঢাকা
কবীর