প্রবন্ধ রচনা
পরিবেশ দূষণ ও প্রতিকার
ভূমিকা: পরিবেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে মানুষ এবং অন্যান্য উদ্ভিদ ও প্রাণী জীবনের বিকাশ ঘটে। পৃথিবীর বুকে যে দিন প্রাণ ও প্রাণীর সৃষ্টি হয়েছিল, সে দিন থেকেই প্রকৃতি আর পরিবেশের মধ্যে ছিল এক সুষম সাম্যতা। মানব জীবন এই পরিবেশের নিগড়ে বন্দি। তাই মানব জীবনে পরিবেশের ভূমিকা অপরিসীম। আবার এই পরিবেশ কোনো না কোনোভাবে মানব জীবনের সভ্যতার বিবর্তনের পথ ধরেই গড়ে উঠেছে। আজকের পরিবেশ তাই সভ্যতার বিবর্তনের ফসল। জীবন বিকাশের নানাবিধ উপকরণের প্রভাব ও প্রয়োগেই আজ পরিবেশ ক্রমশ বিপন্ন আর দূষিত হচ্ছে। শিল্পকারখানা স্থাপনের ফলে সেই কারখানার বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ে চারপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। দূষিত পরিবেশের কারণে প্রকৃতি হারিয়ে ফেলছে ভারসাম্য। ফলে সমগ্র জীবজগৎই আজ বিপন্ন।
পরিবেশ কী: পরিবেশ বলতে পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে বোঝায়। আমাদের চারপাশে আমরা যা দেখি এবং যার প্রভাবে প্রভাবিত হই তাকেই পরিবেশ বলে।
ম্যাকাইভার বলেন, ‘জীবন ও পরিবেশ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত।’
মার্মটিন বেটসের মতে ‘পরিবেশ হলো সে সব বাহ্যিক অবস্থার সমষ্টি, যা জীবনের বিকাশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।’ কাজেই পরিবেশই আমাদের জীবন ধাত্রী।
পরিবেশ দূষণের প্রাথমিক ইতিহাস: কখন থেকে পরিবেশ দূষণ শুরু হয় তার কোনো সঠিক হিসাব জানা না থাকলেও এটা ধারণা করা হয় যে, আদিম যুগের পৃথিবীতে যখন থেকে মানুষ আগুনের ব্যবহার শিখে তখন থেকেই অক্সিজেনের ধ্বংস শুরু হয়। এই অক্সিজেনের ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে কেবল পরিবেশের ভারসাম্যই নষ্ট হয় না। বরং ধোঁয়া ও ভস্ম কণা পরিবেশকে কলুষিত করে।
আরোপড়ুন : শ্রমের মর্যাদা বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা, ৩য় পর্ব
পরিবেশ দূষণের কারণ: পরিবেশ দূষণের অগণিত কারণ রয়েছে। তবে পরিবেশ দূষণের প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয় জনসংখ্যা। পৃথিবীতে জনসংখ্যা দ্রুতগতিতে বেড়েই চলেছে। কিন্তু বাড়ছে না প্রকৃতি প্রদত্ত সম্পদ। যে কারণে সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়ছে প্রতিনিয়ত। বর্ধিত জনসংখ্যার চাহিদা পরিপূরণের জন্য মানুষ নির্মম হাতে ধ্বংস করছে বন সম্পদ। এতে করে একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উদ্ভিদ জগৎ অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাণিজগৎ। এই দুই জগতের ক্ষতি সাধনের ফলে প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য এক সংকটজনক অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। পরিবেশ দূষণের আরেকটি কারণ হলো শক্তি উৎপাদন। শক্তি উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ দূষণের নানা রাসায়নিক দ্রব্য নির্গত হয়।
বনজ সম্পদের বিনষ্টি: বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের মোট আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। সে তুলনায় আমাদের দেশে শতকরা ১৬ ভাগ বনভূমি রয়েছে, যা অপ্রতুল। তদুপরি নির্বিচারে বৃক্ষ কর্তনের ফলে বনভূমির পরিমাণ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। এ নিয়ে বিশ্ববাসী আজ শঙ্কিত। এভাবে আর কয়েক বছর চলতে থাকলে দেশে বনভূমির পরিমাণ শূন্যের কোটায় এসে দাঁড়াবে যার পরিণাম হবে ভয়াবহ। মানুষ, গরু-ছাগল, হাস-মুরগি, পশুপাখিসহ কোনো প্রাণীই বেঁচে থাকবে না, দেখা দেবে মহাবিপর্যয়, বিধ্বস্ত হবে সভ্যতা, ধ্বংস হবে দেশ ও জাতির অস্তিত্ব।
বায়ুদূষণ ও প্রতিক্রিয়া: প্রকৃতির অফুরন্ত নিয়ামক হলো বাতাস। বাতাস ছাড়া পৃথিবীর মানুষই নয় বরং সব জীবজন্তু-গাছপালা এক মুহূর্ত বাঁচতে পারে না। সেই বাতাস আজ দূষিত হয়ে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে এক বিরাট হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন জ্বালানি যেমন- তেল, কয়লা, গ্যাস পুড়ে প্রতিনিয়তই বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তা ছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলেও বাতাসে প্রতিনিয়ত কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের হিসেবে ১৮৬০ সাল পর্যন্ত, ১০০ বছরে পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ২৮৩ পিপিএম থেকে ৩৩০ পিপিএমে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে। এ ছাড়া ক্লোরোফ্লোরো মিথেন, নাইট্রিক অক্সাইড ইত্যাদির মাধ্যমে বায়ু দূষিত হচ্ছে। উপরোক্ত কারণে অসময়ে বৃষ্টি, কুয়াশা, ঝড় ও বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তেল, কয়লা, গ্যাস পুড়ে যে গ্যাসের সৃষ্টি হয় তা থেকে মানুষের মাথা ধরা, শ্বাস কষ্ট, হাঁপানি, দীর্ঘস্থায়ী ব্রংকাইটিস, ফুসফুস ক্যানসার ইত্যাদি রোগের সৃষ্টি হয়।
(বাকি অংশ আগামীকাল প্রকাশ করা হবে)
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা
কবীর