কবিতা : তাহারেই পড়ে মনে
অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: ‘হে কবি নীরব কেন?’ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতার এ চরণে প্রিয়জন হারানোর বিষাদময় স্মৃতি ভুলতে না পেরে নিঃস্ব কবিকে বেদনায় নীরব হতে দেখা যায়।
বসন্ত জাগরণের ঋতু, প্রকৃতিতে নবপ্রাণ সঞ্চারের ঋতু। প্রকৃতিতে বসন্তের আগমন ঘটলেও কবির মনোজগৎ জুড়ে বিরাজ করছে শীতের রিক্ততা ও বিষণ্নতার ছবি। কবির মন দুঃখ-ভারাক্রান্ত। শীতের করুণ বিদায় কবির মনে যে বেদনার ছায়াপাত রেখে গেছে, তা কবি কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। এ কবিতার পুরোটা জুড়ে রয়েছে কবির প্রিয়জন হারানোর গভীর যন্ত্রণার অনুভূতি। এখানে প্রকৃতি ও মানব মনের মিলের দিকটি প্রতীকী তাৎপর্যে তুলে ধরা হয়েছে। কবির নীরবতার কারণটি যেন প্রকৃতির চিরায়ত বৈশিষ্ট্যেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব। মূলত প্রিয়জন হারানোর বেদনায় কাতর কবি স্বাভাবিকভাবেই নিঃস্ব, রিক্ত এবং নীরব হয়ে পড়েন, যা শীতের প্রতীকে উপস্থাপিত হয়েছে।
প্রশ্ন: ‘তাহারেই পড়ে মনে কবিতাটি নাটকীয় গুণসম্পন্ন’ বিষয়টি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতাটি নাটকীয় গুণসম্পন্ন কবিতা; কারণ নাটকীয় সংলাপের রীতিতে কবিতাটি রচিত হয়েছে।
নাটকীয় কবিতার মধ্যে একাধিক চরিত্র বা একাধিক ব্যক্তির কথোপকথন ফুটে ওঠে, যেন তা সংলাপ বিনিময়ের মতো। কবি সুফিয়া কামালের ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতায় নাটকীয়তার ভাব সুস্পষ্ট। গঠনরীতির দিক থেকে এটি একটি সংলাপধর্মী কবিতা। কবিতাটি রচিত হয়েছে কবি ও কবিভক্তের মধ্যে নাটকীয় সংলাপের ভিত্তিতে। এখানে কবিতার সবকটি চরণ কথোপকথনের রীতিতে রচিত হয়েছে। সংলাপগুলো উদ্ধরণ চিহ্নের মধ্যে আবদ্ধ করা হয়েছে। কবিতায় এ ধরনের নাটকীয়তা খুব কমই লক্ষ করা যায়। কবি সুফিয়া কামাল এ নাটকীয়তা সৃষ্টির মাধ্যমে কবিতাটিকে ভিন্নমাত্রায় ভূষিত করেছেন। কবিতায় নাটকীয় সংলাপের ভাব থাকায় একে নাটকীয় গুণসম্পন্ন কবিতা বলা যায়।
আরো পড়ুন : তাহারেই পড়ে মনে কবিতার ৪টি অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর ৬ষ্ঠ পর্ব
প্রশ্ন: “তরী তার এসেছে কি? বেজেছে কি আগমনী গান?
ডেকেছে কি সে আমারে? শুনি নাই, রাখিনি সন্ধান।” ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতার এ চরণে বসন্তের প্রতি কবির তীব্র বিমুখতার বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে; যা কবির স্বজন হারানোর বিষাদঘন মানসিকতার প্রতিচ্ছবি।
প্রিয়জন হারানোর শোকে মুহ্যমান কবি। কবির সে শোকদগ্ধ মনে ঋতুরাজ বসন্তের অপরূপ সমারোহ কোনো আনন্দের বাণী নিয়ে আসেনি। কবি এতই আনমনা যে, তিনি খেয়ালই করেননি প্রকৃতিতে কখন ঋতুরাজের আগমন ঘটেছে। কবির চেতনা আজ বিমূঢ়। ফুলের সুবাস ও পাখির কলরব তার চিত্তে পুলক শিহরণ জাগায়নি। তার বিরহকাতর ব্যথাদীর্ণ হৃদয়ের অনন্ত হাহাকারের জন্যই কবি এসবের সন্ধান রাখেননি। কবি আজ প্রিয়হারা বেদনায় মৌন, তিনি উদাসীন। কবির অনুরাগী জনৈক ভক্তের বসন্তকে বরণ করে নেওয়ার মিনতি জানানোর পরও কবি জানতে চাইলেন দিগন্তের পথ বেয়ে সৌন্দর্যের পসরা বোঝাই বসন্তের তরীখানি এসেছে কি না। কবির মন শীতের রিক্ততায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। কেনই-বা থাকবে না, কবির প্রিয় মানুষটি যে পৃথিবী থেকে চলে গিয়ে কবিকে চিরকালের বেদনা উপহার দিয়ে গেছেন।
প্রশ্ন: “কুহেলি উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী- গিয়াছে চলিয়া ধীরে পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে রিক্ত হস্তে!” ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতার এ চরণে কবির হৃদয়ের গভীর শূন্যতা-হাহাকার-হতাশার অনুভূতি প্রকাশিত হয়েছে। বসন্ত আজ জাগ্রত দ্বারে। দখিনা দুয়ার আজ খোলা; অথচ কবি আজ প্রিয়জনে বিরহিত। তাই শীতের জীর্ণতা আর রিক্ততার মাঝে কবি খুঁজে পান নিজের জীবনের সাদৃশ্য। কবির প্রথম জীবনের আলোর দিশারি প্রিয় মানুষটি পৃথিবীতে আর নেই। যিনি দিয়েছেন কবিকে অনুপ্রেরণা, কবিকে প্রস্ফুটিত ও বিকশিত করার জন্য যার আয়োজন ছিল ব্যাপক, তিনি আজ রিক্ত শীতের মতো পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে হারিয়ে গেছেন। এ বসন্তদিনে মাঘের সন্ন্যাসী যেন গভীর বিষাদের রাগিনী ধ্বনিত করেছে দিক হতে দিগন্তে। কবির আজ আনন্দ নেই, নেই কোনো আয়োজনে সাড়া দেওয়ার অনুভূতি। তাইতো কবি বসন্ত বন্দনায় নিজেকে করেননি ব্যাপৃত। ফিরে গেছেন অতীত জীবনের স্মৃতির কাছে। চারিদিকের পুষ্পিত ফাগুন কবির কাছে বেদনাবিধুর ও ব্যর্থ। স্মৃতির দংশনে কবিমন উদাসী এক বাউল আজ, যেখানে সুখ নেই, নেই কোনো আনন্দের বার্তা। কবির মনে আজ শুধুই রিক্ততার হাহাকার।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ঢাকা
কবীর