গল্প : প্রত্যুপকার
সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর
উদ্দীপকটি পড়ে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর লেখ।
চুরির অভিযোগে কিছু লোক এক ব্যক্তিকে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছে হাজির করল। ঘটনার বিবরণ শুনে তিনি চৌকিদার আমজাদকে ডেকে নির্দেশ দিলেন বন্দিকে তার বাড়িতে আটকে রাখতে। ঘটনাক্রমে আমজাদ জানতে পারলেন বন্দি ব্যক্তি আর কেউ নয়, সে ১০ বছর আগে তার সন্তানকে সড়ক দুর্ঘটনা থেকে বাঁচিয়েছিল এবং নিজ গৃহে নিয়ে গিয়ে আহত সন্তানের সেবা করেছিল। কিন্তু আমজাদ নিজের ক্ষতি হবে ভেবে না চেনার ভান করে চুপ করে রইলেন।
(ক) ‘প্রত্যুপকার’ শব্দের অর্থ কী?
(খ) খলিফা মামুন কিছুক্ষণ মৌন হয়েছিলেন কেন?
(গ) উদ্দীপকের বন্দির ঘটনা ‘প্রত্যুপকার’ গল্পের কোন ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন? ব্যাখ্যা করো।
(ঘ) ‘আমজাদ ও আলী ইবনে আব্বাস উভয়ই বন্দি কর্তৃক উপকৃত হলেও তারা একরকম নয়।’ বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: (ক) ‘প্রত্যুপকার’ শব্দের অর্থ হলো, উপকারীর উপকার করা।
(খ) বন্দি সম্পর্কে সত্য কথা জানার এবং নিজের সিদ্ধান্তের ভুল বুঝতে পারার পর খলিফা মামুন কিছুক্ষণ মৌন হয়েছিলেন।
খলিফা মামুন আলী ইবনে আব্বাসের বিবরণ শুনে এবং বন্দির দয়া, ন্যায়পরায়ণতা ও সদাচরণের কথা জেনে গভীর চিন্তায় মগ্ন হন। তিনি উপলব্ধি করেন, বন্দির মতো মহান ব্যক্তির ওপর মিথ্যা অভিযোগ এনে তার প্রাণদণ্ডের আদেশ দেওয়া ভুল ছিল। নিজের ভুল বুঝতে পেরে তিনি কিছুক্ষণ মৌন ছিলেন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেন।
আরো পড়ুন : প্রত্যুপকার গল্পের ৫টি অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর, ৩য় পর্ব, নবম শ্রেণির বাংলা ১ম পত্র
(গ) উদ্দীপকের বন্দির ঘটনা ‘প্রত্যুপকার’ গল্পে বর্ণিত সেই ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে আলী ইবনে আব্বাস একসময় দামেস্কের এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির আশ্রয় ও সাহায্য লাভ করেছিলেন।
আলী ইবনে আব্বাসকে দামেস্কের সেই ব্যক্তি এক মাস ধরে নিজের বাড়িতে লুকিয়ে রাখেন, নিরাপত্তা দেন এবং অর্থসহ যাবতীয় প্রয়োজন মিটিয়ে তার নিরাপদ প্রস্থান নিশ্চিত করেন। পরে ভাগ্যের ফেরে সেই আশ্রয়দাতা ব্যক্তিই বন্দি হয়ে খলিফার রোষানলে পড়ে আলী ইবনে আব্বাসের জিম্মায় আসেন।
উদ্দীপকের বন্দি ব্যক্তি একসময় আমজাদের সন্তানকে দুর্ঘটনার হাত থেকে বাঁচিয়ে সেবা করেছিলেন, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আমজাদ নিজের স্বার্থ ও ক্ষতির আশঙ্কায় সেই ঘটনা এড়িয়ে যান। উভয় ঘটনায় বন্দি ব্যক্তি আগে জীবন রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ উপকার করেছেন। ‘প্রত্যুপকার’ গল্পে আশ্রয়দাতা প্রাণরক্ষা করেন এবং উদ্দীপকে বন্দি ব্যক্তি দুর্ঘটনায় আহত শিশুর জীবন বাঁচান।
এই দুটি ঘটনার মাধ্যমে কৃতজ্ঞতার মূল্য ও মানবিকতার বৈপরীত্য ফুটে ওঠে। ‘প্রত্যুপকার’ গল্পে কৃতজ্ঞতা ও আত্মত্যাগের উজ্জ্বল উদাহরণ দেওয়া হলেও, উদ্দীপকের ঘটনায় কৃতজ্ঞতার অভাব ও স্বার্থপরতার প্রতিফলন ঘটেছে।
(ঘ) ‘আমজাদ ও আলী ইবনে আব্বাস উভয়ই বন্দি কর্তৃক উপকৃত হলেও এরা একরকম নয়।’ মন্তব্যটি যথার্থ। আমজাদ ও আলী ইবনে আব্বাস উভয়েই বন্দি কর্তৃক অতীতে উপকৃত হয়েছেন, তবে তাদের প্রতিক্রিয়া ও মানসিকতার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
আলী ইবনে আব্বাস দামেস্কের সেই আশ্রয়দাতার মাধ্যমে প্রাণে রক্ষা পেয়েছিলেন। তিনি সেই সাহায্যের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞ ছিলেন এবং যখন তিনি জানতে পারেন যে, তার সেই আশ্রয়দাতা খলিফার রোষানলে বন্দি হয়েছেন, তখন নিজের জীবন ও অবস্থান বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও তাকে মুক্ত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন। এটি তার কৃতজ্ঞতা ও মানবিকতার পরিচায়ক। অন্যদিকে, আমজাদ জানতেন যে, বন্দি ব্যক্তি তার সন্তানের জীবন রক্ষা করেছিলেন, যা অত্যন্ত বড় উপকার। কিন্তু তিনি স্বার্থপর ও সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচয় দিয়ে সেই উপকারের কথা এড়িয়ে যান। তিনি নিজের সম্ভাব্য ক্ষতির ভয়েই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ব্যর্থ হন।
আলী ইবনে আব্বাস নিজের প্রাণ ও খলিফার রোষের ভয় উপেক্ষা করে বন্দির প্রাণ রক্ষার জন্য খলিফার কাছে সুপারিশ করেন এবং তার মুক্তির জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। এটি তার আত্মত্যাগ ও সাহসিকতার উদাহরণ। বিপরীতে, আমজাদ নিজেকে বিপদমুক্ত রাখার জন্য বন্দির উপকারের কথা চেপে যান এবং তাকে সাহায্য করতে কোনো উদ্যোগ নেননি। এটি তার আত্মকেন্দ্রিকতা ও সাহসের অভাবকে তুলে ধরে।
যদিও আমজাদ ও আলী ইবনে আব্বাস একই পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন, তাদের আচরণ ও মানসিকতা এবং নৈতিকতার পার্থক্য স্পষ্ট করে। আলী ইবনে আব্বাস কৃতজ্ঞতার উজ্জ্বল উদাহরণ স্থাপন করেন, সেখানে আমজাদ কৃতজ্ঞতার অভাব ও স্বার্থপরতার পরিচয় দেন। এই বৈপরীত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃত কৃতজ্ঞতা শুধু অনুভূতির বিষয় নয়, বরং তা কার্যকর আচরণ ও দায়িত্ববোধে প্রকাশ পায়।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা
কবীর